ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে আইয়ুবের পরাজয় এবং পরবর্তীতে তাসখন্দ চুক্তি সম্পাদনই প্রথম প্রকাশ্যে আইয়ুব বিরোধী মনোভাব গড়ে তোলে। এই যুদ্ধের ফলাফলে আর্মির মধ্যে আইয়ুব বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠে এবং তাসখন্দ চুক্তিটি পশ্চিম পাকিস্তানীরা তাদের জন্য অপমানজনক বলে মনে করে। তাছাড়া এই যুদ্ধে আইয়ুবকে উস্কানিদাতা ভুট্রোও সবখানে আইয়ুব বিরোধী বক্তব্য দিতে থাকেন।
এ সুযোগে কিছু পাঞ্জাবী রাজনীতিবিদ অসন্তুষ্ট আর্মির সাথে একজোট হয়ে আইয়ুবকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পান।১৯৬৬ সালে পাঞ্জাবি রাজনীতিবিদরা আইয়ুবের নিকট থেকে রাজনৈতিক অধিকার আদায় ও ‘জাতীয় সরকার’ প্রণয়নের জন্য সচেষ্ট হন এবং আইয়ুব বিরোধী জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এতে শেখ মুজিবকে সংযুক্ত করতে চাইলেন।

জানুয়ারিতে আইয়ুব খান ঢাকায় আসেন এবং তিনি বাঙালি বিরোধী দলীয় নেতাদের দেখা করার জন্য আমন্ত্রন জানান। শেখ মুজিব মিটিংয়ে উপস্থাপনের জন্য কিছু দফা অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন যেগুলো স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় বাঙালির স্বার্থ রক্ষা করবে। নুরুল আমিনসহ কিছু আওয়ামীলীগ নেতা শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করেন তাদের ভয় ছিলো তাতে আইয়ুব খান রেগে যাবেন এবং আলোচনা ভেস্তে যাবে। তবে শেখ মুজিব তার অবস্থানে অনড় ছিলেন। মিটিংয়ে হামিদুল হকের নেতৃত্ব মেনে নিতে শেখ মুজিব অস্বীকৃতি জানায় যার ফলে মিটিং শুরু হয়ে সিরিয়াস কিছু আলোচনা ছাড়ায় তা শেষ হয়ে যায়।
পাঞ্জাবি বিরোধী দলীয় নেতারা ৩ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক বিরোধী দলীয় জাতীয় সম্মেলন আহবান করে। লাহোর সম্মেলনে শেখ মুজিব তার দফা সমূহ উপস্থাপন করতে চাইলেন কিন্তু সম্মেলনের সভাপতি তা বাতিল করে দিলেন।ফলে শেখ মুজিব সম্মেলন থেকে ওয়াক আউট করলেন এবং তিনি দফা সমূহ প্রেসে প্রকাশ করে দিলেন আর এভাবেই লাহোর সম্মেলন ভেঙ্গে গেলো।
আইয়ুব ৬ দফাকে অভিহিত করলেন বিচ্ছিন্নতাবাদ অপচেষ্টা এবং ঘোষণা দিলেন অস্ত্রের ভাষায় তিনি এর জবাব দিবেন। এপ্রিলের ১৮ তারিখে শেখ মুজিব গ্রেফতার হলেন এবং ৯ মে “ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলে” তাকে আটক দেখানো হল। ৭ই জুন ছয় দফার সমর্থনে একটি বিশেষ প্রতিবাদ দিবস পালন করা হয়।
আইয়ুব সরকার এটিকে বল প্রয়োগ করে দমন করতে চাইলেন। বিক্ষোভকারীদের উপর গুলিবর্ষণ হলে কয়েকজন নিহিত হয়। পরবর্তীতে বিপুল সংখ্যক গ্রেফতার করা হল এমন নিপীড়নের মুখে আন্দোলন কিছুটা দমে গেলো। ১৯৬৭ এর ডিসেম্বরে পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠে এবং নানারকম গুজবে বাতাস ভারী হয়ে উঠে। কিছুদিন বাদে পাকিস্তান সিবিল সার্ভিসের সকল সিনিয়র কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেশ কয়েকজন বাঙালি কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে জানা গেলো ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিব ও অন্যান্যদের ফাঁসানোর জন্য এই গ্রেফতার করা হয়। যা ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত।যতই এসব আটকের ঘটনা ঘটছিলো ততই উত্তেজনা বাড়ছিলো।
জানুয়ারির প্রথম দিকে প্রকাশিত প্রথম সরকারী প্রেসে অভিযুক্ত হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ছিল না। প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম আসে জানুযারীর ২০ তারিখে প্রকাশিত প্রেস রিলিজে।
পরবর্তী ৫ মাস অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পুরো মামলাটি রেখে দেওয়া হলো। অভিযুক্তদের অবস্থান সম্পর্কে কোন তথ্য দেওয়া হল না। এদের জেল থেকে মিলিটারি জিম্মায় পাঠানো হয়েছিল। বিচার কাজ বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারী করা হলো। ১৯৬৮ এর শেষ দিকে এসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান প্রধান ছাত্র সংঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্টুডেন্ট একশন কমিটি গঠন করা হয়।
স্টুডেন্ট একশন কমিটি ১১ দফা দাবী উত্থাপন করে। আওয়ামীলীগের ছয় দফার সারবস্তু এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আন্দোলনের মাত্রা ক্রমে বাড়ছিল, এরমধ্যে গঠিত হওয়া ডেমোক্র্যটিক একশান কমিটি জানুয়ারীর ১৭ তারিখকে “জাতীয় প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে ঘোষণা করে।
সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে গুলি বর্ষণ করে এতে আসাদ নামে একজন ছাত্র নিহিত হয়। আসাদের মৃত্যুর পর পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ আরো জোড়ালো হয় এবং জরুরী অবস্থা জারী থাকলেও গণআন্দোলন ও মিছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। পুলিশকে সহযোগিতার জন্য সেনা মোতায়েন করা হলো।
এমন পরিস্থিতি দেখে ১৯৬৯ এর ১লা ফেব্রুয়ারী আইয়ুব খান ঘোষনা দিলেন তিনি বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সাথে আলোচনায় বসবেন। এই প্রস্তাবিত আলোচনার নাম দেয়া হল ‘ রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স’।
এ প্রেক্ষিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং শেখ মুজিবের মুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। আইয়ুবের কাছে শেখ মুজিবের মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরা হলে, আইয়ুব তা প্রত্যাখান করেন এবং এতে আইনগত জটিলতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তবে ততদিনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল জরুরী অবস্থা শীঘ্রই প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার হলে মৌলিক অধিকারের প্রবিধান কার্যকর হবে তখন যুক্তি উপস্থাপন করা যাবে সমান অধিকারের আলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে এই বিশেষ ট্রাইবুন্যাল চলতে পারেনা। তখন সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আইনী নোটিশ প্রস্তুত করা হল। যখন এসব প্রক্রিয়া চলছিল এরই মধ্যে সার্জেন্ট জহরুল হককে হত্যা করা হয়।
এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা মামলার প্রিসাইডিং জাজ ও মন্ত্রীদের বাসাসহ অন্যান্য সরকারি বাসভবনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরমধ্যে সরকার ঘোষণা করলেন শেখ মুজিব মুক্ত মানুষ হিসেবে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যোগ দিতে পারবেন। শেখ মুজিবকে প্রস্তাবটি জানানো হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয় যা ছিলো জামিন প্রকৃতির।
শেখ মুজিবকে এই বিষয়ে জানানো হলে তিনি তাতেও রাজি হননি। অবশেষে লিগ্যাল নোটিস অনুযায়ী ট্রায়ালটি সাংবিধানিকভাবে অবৈধ ঘোষনা করে ও ভেঙ্গে দিয়ে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হয়। শেখ মুজিব মুক্ত হয়ে বিরোধী দলীয় নেতা এবং প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সাথে ছয় দফা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় বসেন কিন্তু কোন আলোচনায় ফলপ্রসূ হয়নি।
আইয়ুব খান শেখ মুজিবের সাথে সর্বশেষ মিটিংয়ে সংবিধানের এই পরিবর্তন জাতীয় পরিষদে পাশ হবার জন্য যথেষ্ট সমর্থন পাবেনা এবং এই ধরনের সংশোধন সময় সাপেক্ষ বলে অজুহাত তুললেন।
সংবিধান বাঙালিদের মন মত হলে তা সমর্থন পাবে এবং সংশোধনের খসড়া তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রদান করা হবে এই নিশ্চয়তা দিয়ে শেখ মুজিব মিটিং থেকে ফিরলেন।পরবর্তীতে প্রস্তুতকৃত সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাবটি জাতীয় পরিষদে উঠার আগেই আইয়ুব পদত্যাগ করলেন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহনের সাথে সাথে সংসদ অবলুপ্ত করেন এবং সামরিক শাসন জারি করেন। তবে প্রথম বক্তৃতায় তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিবেন। অল্প সময় পরে তিনি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করেন।
ইয়াহিয়া শীঘ্রই বুঝতে পারলেন বিক্ষুব্ধ জনগণের সাথে প্রকাশ্য মিলিটারী শাসন অনন্তকাল চালানো যাবে না। এরইমধ্যে শেখ মুজিব ও পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন ডিক্রি জারির মাধ্যমে কোনো সংবিধান প্রবর্তন করা হলে বাঙালিদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। একমাত্র সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সংসদ কতৃক প্রণীত সংবিধানই বাঙালিরা মেনে নিবে।এমন অবস্থায় ইয়াহিয়াকে কিছুট ছাড় দিতে হয়েছিল.১৯৬৯ সালের ২৮শে নভেম্বর তিনি ঘোষণা করলেন একটি নির্বাচিত সংসদ স্থাপনের জন্য তিনি আইনগত কাঠামো প্রস্তুত করবে।
এক লোক এক ভোট অথবা জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্বের দাবিটি তিনি মেনে নিলেন এতে জাতীয় পরিষদের ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৯টি পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে গেলো। এককেন্দ্রিক ব্যবস্থাও ভেঙ্গে দেবার ঘোষণা দিলেন। এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেবার উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু ও বেলুচিস্থানের ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে নির্বাচনে তাদের বাঙালিদের সামনে এককভাবে দাঁড় করানো। কারন সিন্ধু ও বেলুচিস্থানের নেতারাও এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলো।
ইয়াহিয়া নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন,ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে কোন দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং এতে তিনি ইচ্ছে মতো সুবিধাজনকভাবে ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। যতই নির্বাচনী প্রচারণা এগুচ্ছিলো,ততই স্পষ্ট হচ্ছিলো আওয়ামীলীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। ফলে অন্যান্য দলগুলো নির্বাচন স্থগিত করার জন্য চেষ্টা চালাতে লাগলো।
আগস্টে বন্যা হওয়ায় তারা নির্বাচন পিছানোর একটা অজুহাত খুজে পেলো। নির্বাচনের তারিখ ৫ই অক্টোবরের পরিবর্তে ৭ই ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হল। এই মুলতবীকরন আওয়ামীলীগেরই কাজে এসেছিল এই বড় সময়ে শেখ মুজিব প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের নিকট যেতে পেরেছিলো।
এরমাঝে নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের উপকূলে ভয়াবহ সাইক্লোন ও জলোচ্ছাস হয়। নির্বাচনী মাঠে অন্য দলগুলো অবস্থা বেগতিক দেখে এই অজুহাতে আবারও নির্বাচন স্থগিতের জন্য আস্ফালন শুরু করতে লাগলো। শেখ মুজিব বুঝলেন নির্বাচন স্থগিতের এই প্রচেষ্টা ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র এবং তিনি হুশিয়ার করে দিলেন এই ধরনের কর্মকান্ড জনগণ প্রতিহত করবে।
এমন অবস্থা দেখে ইয়াহিয়া সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭টি আসনে নির্বাচন স্থগিত করলো এবং অন্যান্য আসনে পূর্বঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন হল। জাতীয় পরিষদে ৩১৫টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ছিলো ১৬৯টি আসন। আওয়ামীলীগ ১৬৭টিতেই জয় লাভ করলো শেখ মুজিব পেল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
এই ফলাফল ইয়াহিয়ার সম্পূর্ণ কৌশলকেই বিশৃঙ্খলায় ফেলে দিল, ইয়াহিয়া দেখলেন তার হাত থেকে ক্ষমতা ফসকে যাচ্ছে। জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং মুজিবের সাথে আলোচনায় বসেন তিনি ৬ দফা বিষয়ে আরো ব্যাখ্যা চাইলেন ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের এই আলোচনা কোন ফলাফল ছাড়ায় শেষ হয়। আলোচনা শেষে ইয়াহিয়া খান ঢাকা থেকে সরাসরি লারকানায় উড়ে যায়। সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়, যা ভুট্রো তার ‘গ্রেট ট্র্যাজেডি’ নামক বইতে উল্লেখ করেন।
সেখানে বাঙালিদের স্তিমিত এবং হতাশ করাই তাদের কৌশল ছিল কিনা তাতে কিছুটা সন্দেহ থেকে যায়। জানুয়ারির ২৭ তারিখে ভুট্রো ঢাকা এলেন শেখ মুজিবের সাথে তার কয়েকদফা আলোচনা হলো। ফিরে যাওয়ার সময় ভুট্রো সংবাদ সম্মেলনে বললেন সমস্যা বেশ জটিল এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে হলে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে ঘটনাপ্রবাহ থেকে বুঝা যাচ্ছিল যে পিপলস পার্টি সংলাপের জন্য কাজ করছে না বরং তারা সংকট ঘনীভূত করতে ভূমিকা রাখছে,যা চলমান সংকটকে সংঘর্ষের দিকে ধাবিত করছে। একাত্তরের ২রা ফেব্রুয়ারি লাহোরে দুইজন তরুন দ্বারা ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতায় হয়।
ভুট্রো এবং পিপলস পার্টি এই দুইজনকে বীরের বেশে লাহোরের রাস্তায় বরন করে নেয় ইন্ডিয়াতে এর তীব্র সমালোচনা হয়। এই ছিনতাইয়ের ফলে ইন্ডিয়া তার আকাশসীমায় পাকিস্তানের সকল ফ্লাইটের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। ভুট্রোর আচরণ এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকতে গড়িমসি এটায় প্রমাণ করছিল যে ইয়াহিয়া এবং সামরিক জান্তা অধিবেশন না করার জন্যে কিছু একটা ষড়যন্ত্র করছে। স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার ব্যাপারে শেখ মুজিব ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই তার নেতাদের সাথে ভিতরে ভিতরে আলোচনা করছিলেন।
সংসদ অধিবেশন নিয়ে গড়িমসিই এমনটা ভাবতে বাধ্য করেছিল। এরকম ঘোষণার ফলে মিলিটারি অ্যাকশনের ব্যাপকতা এবং জনতার প্রতিরোধ ও উত্তোরণ ক্ষমতাও ভালমতো বিবেচনা করা হচ্ছিলো। ১৩ই ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া ঘোষণা দেন ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে।
এই ঘোষণার পর ভুট্রো ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দেন ৬ দফার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত ‘ছাড় না দেয়া সংশোধনমূলক’ কোন সিদ্ধান্ত না হওয়াই তিনি অধিবেশনে যোগ দিবেন না। ১৬ই ও ১৭ই ফেব্রুয়ারি করাচিতে তিনি প্রায় একই রকম বক্তব্য প্রদান করেন। বাঙালিরা বুঝতে পারেন সামরিক জান্তা অথবা সামরিক জান্তার একাংশ কঠিন কোন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এবং ভুট্রো তাদের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে। ফেব্রুয়ারির ১৯ তারিখে ঢাকাতে মিলিটারির আনাগোনা লক্ষ্য করা যায় এবং সংসদের সামনে একটি মেশিনগানের ছাউনি দেখা যায়।
এই দেখে শেখ মুজিব দলের নেতাদের জরুরি সভা ডাকলেন এবং ঐ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাতের বেলায় কোন নেতা বাসায় থাকবেন না। কোন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে নেতারা ঢাকা ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যাবেন এবং মানুষদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন পরে সহসা তেমন কিছু হয়নি।
২১শে ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল এবং অনেকেই ধারনা করেছিলেন সেদিন শহীদ মিনারের সভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন। কিন্তু জনসভায় তিনি বললেন বাঙ্গালিরা ঐক্যবদ্ধ আছে এবং তাদের দাবি মানা না হলে তারা রক্ত দিতে প্রস্তুত আছে। এরমধ্যে ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেন। ঘোষনাটি বাঙালি শ্রোতাদের মাঝে প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
ঐদিন বিকেল তিনটায় শেখ মুজিব আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে হোটেল পূর্বানীতে মিটিংয়ে বসেন। মিটিং থেকে তিনি ৬ দিনের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতালের পাশাপাশি ৭ মার্চ জনসভার ঘোষণা দেন। ৬ই মার্চ শেখ মুজিবের বাসভবনে ৭ই মার্চের জনসভায় কেমন অবস্থান দেখানো হবে তা ঠিক করতে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যেদের নিয়ে একটি মিটিং আহবান করা হল।
৭ই মার্চ আসতে আসতে পরিস্থিতি এমন হলো যে,ছাত্রসমাজ,তরুণেরা এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনতার বড় একটি অংশ স্বাধীনতার ঘোষণা ব্যতীত অন্যকিছু মেনে নিবে কিনা সে সন্দেহ পার্টির সদস্যেদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল। একমুখী স্বাধীনতার ঘোষণার ফলে পুর্ন সামরিক শক্তির আক্রমণ হতে পারে নিরস্ত্র জনতা কি এমন আক্রমণ সহ্য করে কি বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে? বহির্বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কি হবে?পাকিস্তান সরকার কি স্বাধীন বাংলাদেশকে সহজেই স্বীকৃতি দিবে?
স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত একটি শক্তিশালী মিলিটারী আক্রমণের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার কি টিকে থাকতে পারবে? তখন আরো অনেক প্রশ্নের সাথে এসব প্রশ্নগুলো উদ্বেগের সাথে আলোচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার গুরুদায়িত্বটি ছিল শেখ মুজিবের একার কাঁধে। তিনি আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে যে সেনাবাহিনীকে সামরিক আগ্রাসনের সুযোগ করে দিবে তা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। সিদ্ধান্ত হলো এমন সুযোগ তাদের করে দেওয়া যাবে না। ইয়াহিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা এসব দাবীতে আন্দোলন চালিয়ে নেয়া এবং যার শেষ পরিণতি হবে “স্বাধীনতা’।
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল মাত্র ১৯ মিনিটের, ঐ ভাষণের সবচেয়ে কার্যকরী বাক্যটি ছিল “ এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারে সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।মার্চের ১৫ তারিখে ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন শেখ মুজিব ১৬ই মার্চ সকালে তার সাথে দেখা করেন। মার্শাল ল’ প্রত্যাহার ও জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিষয় নিয়ে ২১শে মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনা হয়।
২২ তারিখটি ছিল সমঝোতার জন্য সম্ভাবনাময় একটি দিন। ২৩শে মার্চ যখন আওয়ামীলীগ প্রতিনিধিদল আলোচনায় প্রবেশ করেন তখন তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় অর্থনীতির বিধিনিষেধগুলো পরীক্ষা করার জন্য সরকারে পক্ষ থেকে আরো কিছু অর্থনীতিবিদকে আনা হয়েছে এবং তারা এই বিষয়গুলো নিয়ে আওয়ামীলীগের অর্থনীতিবিদদের সাথে আলাদাভাবে আলোচনায় বসতে চায়।
যেহেতু খসড়া প্রস্তুতের শুরু থেকে আওয়ামীলীগের অর্থনীতিবিদদের সাথে সরকারের অর্থনীতিবিদরা ছিলেন সেহেতু আওয়ামীলীগের অর্থনীতিবিদগন আলাদাভাবে বসতে রাজি ছিলেন না কারন এতে সময় নষ্ট ছাড়া ইয়াহিয়ার আর কোন ইচ্ছা প্রকাশ পায়না।
২৩শে মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামীলীগ প্রতিনিধদল পুনরায় অর্থনৈতিক বিধান সমূহ নিয়ে আলোচনার জন্য ফিরে গিয়ে জানতে পারেন ইয়াহিয়া সারাদিন প্রেসিডেন্ট হাউজে ছিলেন না। পরে জানা যায় সেদিন জেনারেলরা মিটিংয়ে বসেছিলেন এবং এদিনই অপারেশন সার্চলাইট চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরমধ্যে আওয়ামীলীগের প্রতিনিধিদল এটা আঁচ করতে পারছিলেন বাইরের অবস্থা খুবই গুরুতর।
কারণ আর্মি চট্রগ্রামে এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে যাচ্ছিলো এবং হাজার হাজার জনতা তাঁদের বন্দরে যাবার পথে বাঁধার সৃষ্টি করেছিল। রংপুর থেকে মিলিটারি অপারেশনের খবর এসেছিল,ঢাকাতে এমন খবরও পৌছাচ্ছিল যে মিলিটারি অপারেশনের আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারনে মনে হচ্চিলো যে ২৪ তারিখের মিটিংটাই শেষ মিটিং হতে যাচ্ছে। সেখানে আলোচনা সমাপ্তির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া উচিৎ এবং কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনার আর সুযোগ নেই।
সন্ধ্যায় সম্পূর্ণ খসড়া তৈরি শেষ করা হয়। আওয়ামীলীগ প্রতিনিধিদল চাচ্ছিল ঐদিন রাতেই যেনো খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু সরকারের প্রতিনিধিদল ঐদিন খসড়াটি চূড়ান্ত না করার জন্য বলেন এবং পরদিন সকালে দেখা করার প্রস্তাব দেন।
আওয়ামীলীগ পক্ষ থেকে সকালে একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করার জন্য প্রস্তাব করা হয় ঐ পক্ষ থেকে বলা হয় এটা ফোনে যোগাযোগ করে ঠিক করা হবে। ২৫ তারিখ সারাদিন ঐ পক্ষ থেকে আর কোন ফোন আসেনি এবং সে রাতেই আর্মি বাঙালির উপর গণহত্যা ও রক্তস্নাতের আক্রমণ শুরু করে।

২৬শে মার্চ কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ক্যাপ্টেন রফিক সি,আর,বির টিলায় অবস্থান নিয়েছিলেন এই সময়ে আনিসুজ্জামানের সাথে তার টেলিফোনে কথা হয়। তখন চট্রগ্রাম ডাকবাংলোতে অথবা রেলওয়ে রেস্ট হাউসে সংগ্রাম পরিষদের একটি অফিস কাজ করছিল। সেখান থেকে একজন টেলিফোন করে আনিসুজ্জামানকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে শোনান এবং তা লিখে নিয়ে সবাইকে জানাতে বলেন।
এরপর আনিসুজ্জামানের নিকট থেকে ঘোষণার বিষয়টি এম,এ,হান্নান জানতে পারেন এবং তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ করেন। ২৭শে মার্চ বেতারে মেজর জিয়ার প্রথম ঘোষণা প্রচারিত হয় তা শুনে চট্রগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভিসি আজিজুর রহমান মল্লিক টেলিফোনে এম,এ,হান্নাঙ্কে বলেন ঘোষণায় বঙ্গবন্ধুর নাম যোগ করা আবশ্যক,তা না হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না।
মেজর জিয়া পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নামে ও পক্ষে ঘোষণা করেন। এইভাবে সর্বত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
আইনুল ইসলাম বিশাল, শিক্ষানবিশ আইনজীবী।
Discussion about this post