বাংলাদেশে আইন পেশার অতীত ও বর্তমান
আইন পেশা প্রাচীন পেশাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে এ পেশার ইতিহাস পুরনো। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় আইনচর্চা মহৎ পেশা হিসেবে স্বীকৃত ছিল। মুসলিম যুগে বিচারক (কাজী) এবং আইনজীবী (মুফতি), উভয়ই ইসলামি শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
মুফতিরা আদালতে আইনজীবীর ভূমিকা পালন করতেন এবং একই ভূমিকা পালন করতেন হিন্দু পণ্ডিতরাও। এ সময়ে আইনজীবীরা ওয়কিল হিসেবে পরিচিত ছিলেন।গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস কোম্পানির বিচার কাজের সুবিধার্থে ১৭৯৩ সালে আইনের মাধ্যমে ইংরেজ আদলে আইন পেশার সূচনা করেন।
উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের বেশির ভাগ ব্যক্তি ছিলেন পেশায় আইনজীবী। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে আইন পেশার সদস্যরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় আইনজীবীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আইনজীবীর জীবন কঠিন সংগ্রামের জীবন। তাকে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করতে হয়। সংগ্রামের ওপরই তার সফলতা নির্ভর করে। সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে তিনি অর্জন করেন সম্মান, যশ, অর্থবিত্ত এবং ক্ষমতা-প্রতিপত্তি। সমাজে দ্বিতীয় কোনো পেশা নেই যার মাধ্যমে সম্মান, সম্পদ ও ক্ষমতা একই সাথে লাভ করা যায়।
একজন সফল ব্যবসায়ী অর্থসম্পদের মালিক হতে পারেন, রাজনীতিবিদ ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন এবং সমাজসেবক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হতে পারেন, কিন্তু একজন আইনজীবী এর সবই অর্জন করতে সক্ষম। এ দিক থেকে আইন পেশা স্বতন্ত্র মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অনেক সমাজবিজ্ঞানী আইন পেশাকে সর্বশ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আইনজীবী এই মহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশার সদস্য হতে হলে একজন আইনজীবীকে অবশ্যই বিশেষ গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। সর্বাবস্থায় তাকে মক্কেলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে।
আইনজীবীর পেশাদারিত্ব নির্ভর করে তার জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও চরিত্রের ওপর। একজন পেশাদার আইনজীবীর জন্য সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। প্রচলিত আইন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি দায়িত্বশীল, যোগ্য এবং পেশাদার আইনজীবী তৈরি করতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে কি না এর পর্যালোচনা প্রয়োজন এবং যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টিতে এটা কতটা সহায়ক ভূমিকা রাখছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে।

ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান আইন পেশার সদস্যদের জন্য অপরিহার্য। আইন এমনি একটি বিজ্ঞান, যার জ্ঞান আইন পেশায় যোগদানের জন্য অত্যাবশ্যক। সমাজ থেকে দারিদ্র্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি উচ্ছেদসহ আইনের শাসনের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেতনা সৃষ্টি করার সহায়ক শিক্ষা আইন পেশার জন্য অপরিহার্য।
আইনি শিক্ষার উদ্দেশ্যই হতে হবে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের চেতনা সৃষ্টি। ভবিষ্যৎ আইনজীবীকে গড়ে তুলতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্য ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ভবিষ্যৎ আইনজীবীকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। আইনের ধারা-উপধারা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান দেয়ার চেয়ে আইনের মৌলিক নীতিগুলোর জ্ঞান থাকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে আইনজীবী সম্প্রদায় এক মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের প্রফেসর ড. শেখ আকরাম আলী বলেন , বর্তমানে আইনজীবী সম্প্রদায় এক মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এর নাম অতিরিক্ত রাজনীতি চর্চা। রাজনীতি করা অন্যায় নয়; বরং দেশ ও সমাজ সেবার অন্যতম প্রধান পথ।
ব্যক্তি হিসেবে আইনজীবী রাজনীতি করতেই পারেন- এটা তার নাগরিক অধিকার। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন না। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে আইনজীবী সম্প্রদায়কে নিয়ে। দেশ ও পেশার স্বার্থে নিরপেক্ষ থাকা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আইনজীবী সমাজ দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে এবং জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। অথচ ঐক্যবদ্ধ থাকাই যেকোনো পেশার মূল বৈশিষ্ট্য।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনজীবী সম্প্রদায় অন্যান্য পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মতো দলীয় রাজনীতির বশংবদে পরিণত হচ্ছে। অতিমাত্রায় সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী কখনো দলের স্বার্থের বাইরে ভূমিকা রাখতে পারেন না। জাতির বিবেক বলে পরিচিত আইনজীবী সম্প্রদায় অনেক সময় কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
নিরপেক্ষ আইনজীবীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে উচ্চ আদালতের জন্য নিরপেক্ষ বিচারক পাওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছ। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং এই পেশার মর্যাদা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। তা হলেই ফিরে আসবে আইন পেশার ঐতিহ্য। দেশ ও জাতি নিঃসন্দেহে এতে উপকৃত হবে।
Discussion about this post