বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে বিস্তারিত
বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা সকল নাগরিকের অত্যন্ত জরুরি। সংবিধান সম্পর্কে জানতে হলে সাংবিধানিক আইনের (Full Ideas of Constitutional Law) পরিপূর্ণ ধারণার জন্য একটি দেশের অন্যান্য সাধারণ আইন সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকা আবশ্যক। একটি দেশের আইনকে মোটামুটি দু’ভাগে ভাগ করা যায়:
(১) সরকার সম্পর্কিত আইন (Public Law); এবং
(২) ব্যক্তি সংক্রান্ত আইন ( Private Law)
১. সরকার সম্পর্কিত আইন
যে আইন রাষ্ট্রের প্রকৃতি, সরকারের গঠন, কার্যাবলী, ক্ষমতা, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব ও কার্যাবলী এবং রাষ্টের সাথে নাগরিকের সম্পর্ক নির্ধারণ করে তাকে সরকার সম্পর্কিত আইন বলে।
সরকার সম্পর্কিত আইনের দু’টি ভাগ রয়েছে:
১. সাংবিধানিক আইন (Constitutional Law ); এবং
২. প্রশাসনিক আইন (Administrative Law )।
১. সাংবিধানিক আইন:
সাংবিধানিক আইন বলতে সরকার সম্পর্কিত সে আইন কে বোঝায় যে আইন রাষ্ট্রের প্রকৃতি, সরকারের গঠন, কার্যাবলী, ক্ষমতা, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব ও কার্যাবলী এবং রাষ্টের সাথে নাগরিকের সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
২. প্রশাসনিক আইন:
প্রশাসনিক আইন বলতে সরকার সম্পর্কিত সেই আইনকে বোঝায় যা সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে শুধু প্রশাসনিক দিক নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ অধীনস্ত কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব, তাদের মাঝে ক্ষমতা বন্টন, ব্যক্তি এবং প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাঝে সম্পর্ক র্নির্ধারণ করে।
২. ব্যক্তি সংক্রান্ত আইন
যে আইন ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণ করে , নাগরিকের পারস্পরিক অধিকার সংজ্ঞায়িত করে এবং অধিকারগুলো রক্ষা করার পদ্ধতি নির্ধারণ করে তাকে ব্যক্তি সংক্রান্ত আইন বলে। উদাহরণ:- Law of person, Law of Contract, Law of Property, Law of tort ইত্যাদি ব্যক্তি সম্পর্কিত আইন।
ব্যক্তি সংক্রান্ত আইনকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
(১) তত্ত্বগত আইন (Substantive Law); এবং
(২) পদ্ধতিগত আইন (Procedural Law ) ।
১. তত্ত্বগত আইন:
যে আইন ব্যক্তির অধিকারকে সৃষ্টি করে বা সংজ্ঞায়িত করে তাকে তত্বগত আইন বলে। যেমন: চুক্তি আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ইত্যাদি ।
২. পদ্ধতিগত আইন
যে আইন অধকার রক্ষা করার পদ্ধতি নির্র্ধারণ করে তাকে পদ্ধতিগত আইন বলে। যেমন: দেওয়ানী কার্যবিধি, ফৌজদারী কার্যবিধি ইত্যাদি। উদাহরণ, কোন সম্পত্তিতে আমার দখল আছে কিনা তা তত্ত্বগত আইনের বিষয় কিন্তু কখন কোন আদালতে আমাকে মামলা দায়ের করতে হবে তা পদ্ধতিগত আইন নিধারণ করে দেয়।
সাংবিধানিক আইন:
সাংবিধানিক আইন ইহা সকল আইনের ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করে থাকে। গেটেলের ভাষায়:
“ইহা রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম শক্তির অবস্থান ক্ষেত্র নির্ণয় করে এবং আইনের উৎসের নির্দেশ করে।”
মনে রাখবেন একটি দেশের কোন আইনই সাংবিধানিক আইনের তুলনায় মর্যাদাসম্পন্ন নয়।
সাংবিধানিক আইন থেকেই অন্যান্য আইন বৈধতা লাভ করে। একটি দেশের তত্ত্বগত আইন, পদ্ধতিগত আইন , প্রশাসনিক আইন ইত্যাদি সকল আইন সাংবিধানিক আইনের নিম্নে্া পর্যায়ে অবস্থান করে। এ সকল আইনের কোন বিধানই সাংবিধানিক আইনের বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। এ কারণে সাংবিধানিক আইন একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন।
সাংবিধানিক আইনকে অন্যান্য আইনের বৈধতা নির্ণয়ের মাপকাঠি বা কষ্টি পাথর (touch stone) বলা হয়।
সাংবিধানিক আইনকে যদি একটি দেশের মৌলিক আইন ধরা হয় তাহলে একটি দেশের আইনকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা য়ায়:
(১) সাংবিধানিক আইন বা মৌলিক আইন (Constitutional or fundamental Law ); এবং
(২) সাধারণ আইন (Ordinary Law )।
মনে রাখবেন রাষ্ট্রের সকল প্রশাসনিক, পদ্ধতিগত, তত্ত্বগত আইন সাধারণ আইনের পর্যায়ে পড়ে। এগুলো সাধারণ আইন বলার কারণ হলো যে, এগুলো সাংবিধানিক আইনের চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন এবং সাংবিধানিক আইনের বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। এই জাতীয় আইন পাশ করতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান পাশ করা বা পরিবর্তন করার জন্য জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। যেমন, দুই-তৃতীয়াংশ বা তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন।
সংবিধান (Constitution) কি?

একটি দেশে সরকার বলতে শাসন বিভাগ , আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগকে বোঝায়। সরকারের এই বিভাগগুলোর মধ্যে ক্ষমতার বন্টন কিভাবে হবে, কিভাবে সরকারী কাজ পরিচালিত হবে এবং রাষ্ট্রাধীন ব্যক্তিসমূহের সাথে সরকারের কি সম্পর্ক হবে ইত্যাদি বিষয়ে কতোগুলো নিয়ম-কানুন থাকে। এ নিয়ম-কানুনগুলাই হলো সংবিধান।
বাংলাদেশের সংবিধান বা শাসনতন্ত্র অনুযায়ী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে । সংবিধানকে টপকিয়ে কোন কাজ করার ক্ষমতা সরকারের থাকে না। এ জন্য সংবিধান হলো রাষ্ট্র পরিচালনার চাবি কাঠি (Government wheel of the state), Thomas Paine “Rights of man” ) গ্রন্থে লিখেছেন: “ Government without a Constitutions is a power without a right”
বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বাংলাদেশের সংবিধান কে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
১. রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এরিস্টটলের মতে- ‘‘সংবিধান হলো রাষ্টের এমন এক জীবন পদ্ধতি যা রাষ্ট্র স্বয়ং নিজের জন্য বেছে নিয়েছে ।”
২. C.F. Strong এর মতে- “সংবিধান হলো সেইসব নিয়ম-কানুনের সমষ্ট্রি যা দ্বারা সরকারের ক্ষমতা , শাসিতের অধিকার এবং শাসক ও শাসিতের মাঝে সম্পর্ক নির্ধারিত হয়।
প্রকৃত অর্থে সংবিধান বলতে শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী লিখিত ও অলিখিত উভয় নিয়ম-কানুনকেই বোঝায়। কারণ ব্রিটেনে যেমন অলিখিত সংবিধান কিন্তু সেখানে শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত অনেক বিধান লিখিত( যেমন- Magna Carta, Bill of Rights )। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন কেবিনেট, রাজনৈতিক দল, কংগ্রেসের কমিটি ইত্যাদি সংক্রান্ত বিধান অলিখিত।
সুতরাং সংবিধান হলো লিখিত বা অলিখিত কতগুলো আইনের সমষ্টি যা রাষ্ট্রের প্রকৃতি, সরকারের ধরন নির্দেশ করে, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মাঝে ক্ষমতা নির্ধারণ করে এবং শাসক ও শাসিতের মাঝে সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের সংবিধান কত প্রকার :
সংবিধান প্রথমত (১) লিখিত ও অলিখিত; (২) দুস্পরিবর্তনীয় ও সুপরিবর্তনীয় এই দুই পদ্ধতিতে ভাগ করা হয়ে থাকে।
ইহা বিশেষ দিনে বিশেষ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পাশ করা হয়ে থাকে । ইহাকে দলিল আকারে দেখানো যায়। যেমন:- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান এবং বাংলাদেশের সংবিধান ইত্যাদি।
অপরদিকে যে সংবিধানে ,শাসনব্যাস্থা সম্পর্কিত মৌলিক নীতিগুলো এক বা একাধিক দলিলে লিখিত নেই বরং মৌলিক নীতিগুলো বিভিন্ন আচার, প্রথা , রীতি-নীতি এবং বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে বিরাজমান থাকে তাকে অলিখিত সংবিধান বলে । ইহা কোন বিশেষ দিনে কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পাশ করা হয় না। যেমন:-ব্রিটিশ সংবিধান।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিষ্ঠা:-
স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে গণপরিষদের মাধ্যমে পূণাঙ্গ সংবিধান কার্যকরী করা হয় ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। ৪০৩ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদের কর্মতৎপরতা চলে। এদের মধ্যে ৪০০ জন ছিলেন আওয়ামী লীগ এবং ৩ জন ছিলেন বিরোধীদলীয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ:-
রাষ্ট্র পরিচালণার মূলনীতি ৪ টি :
(১) জাতীয়তাবাদ;
(২) সমাজতন্ত্র;
(৩) গনতন্ত্র; এবং
(৪) ধর্মনিরপেক্ষতা।
কোন কোন ক্ষেত্রে এই চারটি নীতি প্রয়োগ হবে:
সংবিধানের ৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, চারটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোকে প্রয়োগ করা হবে:
(১) দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে মৌলিক সূত্র হিসেবে গণ্য হবে।
(২) আইন প্রণয়নকালে প্রয়োগ করা হবে।
(৩) বাংলাদেশের সংবিধান ও অন্যান্য আইনের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলো দিশারী, নির্দেশক তথা মানদন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
(৪) রাষ্ট্র ও নাগরিকদের কার্যের ভিত্তি হবে এই নীতিগুলো।
মৌলিক অধিকার:
বাংলাদেশ সংবিধানে ১৮টি মৌলিক অধিকার উল্লেখ কারা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ পর্যন্ত ১৮টি অধিকারের প্রকৃতি ও ভোগের নিশ্চয়তা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।এই অধিকার গুলো সবই পৌরCivil) ও রাজনৈতিক (Political ) অধিকার।
শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিকরা ভোগ করতে পারেন- এরূপ ১২ টি মৌলিক অধিকার। অধিকার গুলো হলো :- ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪২, এবং ৪৩ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অধিকারসমূহ।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, মৌলিক অধিকার বলবৎকরণের জন্যে ১০২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা দায়ের করা যাবে।
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন:-
বাংলাদেশ সংবিধানের সংশোধনী সম্পর্কে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ এর ভেতর চমৎকারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধান এই পর্যন্ত ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে যেহেতু মানুষের জন্য আইন,আইনের জন্য মানুষ নয় সুতরাং মানুষের প্রয়োজনে দেশের স্বার্থে বার বার সংবিধানের সংশোধনী আনতে পারে। তবে সংবিধানে উল্লেখিত ১৮ টি মৌলিক অধিকার সমূহ পরিবর্তন করা নিষেধ।
বাংলাদেশের সংবিধান বিভাগ, বিষয় ও অনুচ্ছেদ সমূহ বিস্তারিত:-
বাংলাদেশ সংবিধানের ১১টি ভাগ , ১৫৩ টি অনুচ্ছেদ ও ৭ টি তফসিল রয়েছে।
১১ টি ভাগ সমূহ নিচে দেওয়া হলো:-
প্রথম:- প্রজাতন্ত্র
দ্বিতীয়:- রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
তৃতীয়:- মৌলিক অধিকার
চতুর্থ:- নির্বাহী বিভাগ
পঞ্চম :- আইনসভা
ষষ্ঠ:- বিচার বিভাগ
সপ্তম:- নির্বাচন
অষ্টম:- মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক
নবম:- বাংলাদেশের কর্মবিভাগ
দশম:- সংবিধান সংশোধন
একাদশ:বিবিধ
বাংলাদেশের সাংবিধানিক পদসমূহ( Constitutional Posts )
১. রাষ্ট্রপতি (President)
২. প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী (Prime Minister, Ministers, Ministers of state & Deputy Ministers)
৩. অ্যাটর্নি জেনারেল (Attorney General)
৪. সংসদ সদস্য (Members of Parliament সংক্ষেপে MP )
৫. স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার (Speaker and Deputy Speaker)
৬. ন্যায়পাল(Ombudsman)
৭. প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতি (Chief Justice and other Judges )
৮. প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner & Other Commissioners)
৯. মহা হিসাব নিরীক্ষক (Auditor General )
১০.সরকারী কর্ম কমিশনের সভাপতি ও সদস্যগণ (Chairman of PSC and other members )
বি.দ্র.: ন্যায়পাল পদটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

পরিশেষে বলা য়ায় যে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সংবিধান সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখা দরকার । ধন্যবাদ
লেখকঃ ল ফর ন্যাশনস, ইমেইলঃ lawfornations.abm@gmail.com, মোবাইল: 01842459590.
সংবিধান সম্পর্কে আরো জানতে একনজরে বাংলাদেশ সংবিধানের সংশোধনীসমূহ দেখুন
Discussion about this post