মোঃ রায়হান আলী
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর ২৯ মে শনিবার বার কাউন্সিলের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হতে যাচ্ছে। ফলপ্রার্থীরা উদ্বেগ,উৎকন্ঠা,নির্ঘুম আর হতাশায় শনিবারের অপেক্ষায় সময়ের প্রহর গুনছে। এমনটা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। একদিকে দীর্ঘ ৩/৪ বছর পর পরীক্ষা;অন্যদিকে অজানা সিলেবাসে দু’ধাপে সর্বকালের কঠিনতম প্রশ্নে পরীক্ষায় উত্তর দেওয়া। উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে রেজাল্ট ব্যবস্থায় আমরা এটা শতভাগ নিশ্চিত যে সকলেরই ফলাফল ভাল হবেনা। অনেকে পাশ আর অনেকে ফেল করে থাকবে এটা নিশ্চিত।
তবে যাঁরা পাশ করবে তাঁদের জন্য থাকবে শুভেচ্ছা;আর যাঁরা ফেল করবে তাঁদের জন্যও থাকবে শুভকামনা ও সর্বাঙ্গীন উন্নতির প্রত্যাশা। যতই আমরা আবেগ দিয়ে বলিনা কেন সকলের জন্য মঙ্গল কামনা করছি। আসলে কি এ রেজাল্টে সকলের মঙ্গল(পাশ) হবে? নিশ্চয়ই হবেনা।
আবার এটাও সত্য যে সৃষ্টিকর্তা যা করে তা,কোন না কোন ভাবে মঙ্গলের জন্যে করে। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন যে আমি ফেল করলেও সৃষ্টিকর্তা কিভাবে আসলে আমার মঙ্গল করেছে?এ প্রশ্নের উত্তরে বলবো আজ ফেল করে হয়তবা আপনার পরিবারের কিংবা সমাজের কাছে আপনি কিছুটা হেয় প্রতিপন্ন হবেন কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পরবর্তীতে হয়তবা ভাল কিছু রেখেছেন। পক্ষান্তরে আপনার বন্ধু পাশ করে তার কলঙ্কিত জীবনের কিছুটা পথ অতিক্রম করে সামনের দিকে ধাবমান;অর্থাৎ সীমাহীন আনন্দ আর উদ্বেলে সময় কাটাবে।

আমরা যে ভুল সিদ্ধান্তে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করে বিপদে;তা এখন সবাই হারে-হারে উপলব্ধি করতে পারছি। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়াটা যে কতটা কষ্টদায়ক তা একমাত্র ভূক্তভোগীরাই জানে। এ প্রসঙ্গে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটা ঘটনা আপনাদের মাঝে শেয়ার কববো।
আমি ২০০২ সালে এস,এস,সি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আমরা একদম ক্লোজ বন্ধু ছিলাম ৬ জন। ৬ জনেই সে বছর পরীক্ষায় ফেল করলাম। কিন্তু ৬ জনের মধ্যে একজন বন্ধুর (F) গ্রেড এসেছে;এক বিষয় ফেল করার কারনে। আর আমরা বাকি ৫ জন একাধিক বিষয় ফেল করার কারনে ভাগ্যে (F) গ্রেডও জোটেনি। সেদিন যে কষ্ট আমি পেয়েছিলাম তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারবো না। এটুকু বলবো সারারাত শুধু কেঁদেছি।
আর (F) গ্রেড পাওয়া বন্ধুটির মনে আনন্দের মিছিল বয়ে চলেছিল। কারণ সে কলেজে ভর্তি হতে পারবে। তার মানে সে (F) গ্রেড পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে পারছে;কিন্তু কলেজে ভর্তি হয়ে ফেল করা বিষয়টা পরবর্তী বছরে পাশ করলে কলেজের প্রোমোশন তার ঠিক থাকবে আর ফেল করলে কলেজ থেকে আউট। এমনটা নিয়ম ছিল সেসময়। আমি সহ বাকী ৫ জন বন্ধু কস্টে দিন কাটাচ্ছিলাম। পরবর্তীতে পরীক্ষায় অংশগ্রহনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
আর (F) গ্রেড পাওয়া বন্ধুটি কলেজে ভর্তি হয়ে শার্ট,প্যান্ট ইন করে কি যে মোশানে,অহংকারে আমাদের সামনে দিয়ে কলেজে গর্বের সহিত যায় তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। পরবর্তী বছরে আমরা ৫জন আবার বাকি বিষয়গুলি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলাম। কিন্তু (F)গ্রেড পাওয়া বন্ধুটা ঐ এক বিষয় পরীক্ষা দিয়েই ফেল করে কলেজ থেকে আউট;আর আমরা ইন। এটার নাম হল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।
তখন থেকেই আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তা যে রেজাল্টেই দিক না কেন তাতে আমাদের কোন না কোন ভাবেই মঙ্গল অন্তর্নিহিত আছে। কারণ আমরা যত পরিকল্পনাই করি না কেন সৃষ্টিকর্তাই সবচেয়ে বড় পরিকল্পনাকারী। এ রেজাল্টকে ঘিরে অনেকের দীর্ঘ মেয়াদী স্বপ্ন। কেউ করবে বিয়ে!কেউবা আবার ভাইবার প্রস্তুতি আবার যাঁরা ফেল করবে তাদের মধ্য হইতে অনেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে এ পেশার মায়া ত্যাগ করে চলে যাবে অন্য পেশায়(যদিও এটা কাম্য নয়)।
জানিনা কার ভাগ্যে আল্লাহ্ কি লিখে রেখেছেন। সবচেয়ে বড় যে পরিবার থেকে কথাটি আমাদের শুনতে হয় তা হল “তুই উকিল হবি কবে?”আমরা এ কথাটির সদুত্তর কেউ দিতে পারি না। মাথা নিচু করে বধির হয়ে শুনতেছি দীর্ঘ ৩/৪/৫/৬ বছর ধরে। আদৌ যে কবে এর সদুত্তর মিলবে তা সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানে।
সর্বপরি বলবো আমাদের রেজাল্ট যেমনই তথা পাশ/ফেল আসুক না কেন তা আমরা যেন মেনে নেই। কারণ আমরা তো ক্রিকেট খেলার মত টেস্ট খেলতে নেমেছি!সেজন্য উকিল হতে হলে ধৈর্য্য ধরে গুরু-শিশ্যের ভেল্কিবাজিতে ভুল শট না খেলে ক্রিজে থিতো হয়ে রান করে গেম উইন করে বেড়িয়ে আসতে হবে।
আর আমাদের মধ্য হইতে যারা রেজাল্ট খারাপ করবে তাদেরকে যেন পাশ করা বন্ধুরা সান্ত্বনা দেয় ও অনুপ্রেরণা জোগায় এটাই সকলের কাছে কাম্য। একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসতে হবে;দিতে হবে সান্ত্বনা। যদি অন্যের বিপদে কাঁদেনা তোমার মন;তোমার বিপদে চোখের পানি মুছে দেওয়ার মত লোক হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না।

একটা বিষয় প্রতিনিয়তই অনেক বন্ধুদের কাছে অভিযোগ যে,পাশ করা বন্ধুরা অধিকাংশ ফেল করা বন্ধুদের সান্ত্বনা ও অনুপ্রেরণা তো দূরের কথা বরং আরো অবহেলা ও ছোট করে দেখে। এমনকি কোর্ট অঞ্চলে দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যায়! আসলে যদি এমনটা হয় তাহলে সেটা সত্যিই খুব বেমানান ও অপ্রিতিকর। এমন ঘটনা যেন আমরা আর শুনতে না পাই সেজন্য আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ববোধ,মনুষ্যবোধ,সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ জাগ্রত করতে হবে।
Discussion about this post