মুসলিম আইনে সম্পত্তি দানে দাতার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
এডভোকেট মো: হাবিবুল হক
মৃত্যু ব্যধিগ্রস্ত অবস্থায় মোট সম্পত্তির ১/৩ অংশের বেশী দান করতে পারে না। এক্ষেত্রে-নাবালকের দান বাতিল হবে না; অজ্ঞাত ব্যক্তির অনুকূলে দান বাতিল হবে।
বিশ্লেষণ: সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ ধারায় দানের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, এই ধারায় বলা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ও কোন প্রকার পণ গ্রহণ না করে কোন অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি অপর ব্যক্তিকে হস্তান্তর করলে এবং সেই ব্যক্তি বা কার ও পক্ষে অন্য কেউ তা গ্রহণ করলে তাকে বলা হয় দান।
যে ব্যক্তি অনুরূপভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করে তাকে বলা হয় দাতা এবং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে তাকে বলা হয় দানগ্রহীতা।
আর দান কখন গ্রহণ করতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে দাতার জীবদ্দশায় এবং সে যখন দান করতে সম্পূর্ণ সক্ষম সেই অবস্থায় অনুরুপ হস্তান্তর গ্রহণ করতে হয়। দান গ্রহণের পূর্বে দানগ্রহীতার যদি মৃত্যু ঘটে, তাহলে উক্ত দান বাতিল বলে গন্য হবে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২২ধারাটি বিশ্লেষণ করলে দান এর নিম্নবর্ণিত উপাদানসমূহ লক্ষ্য করা যায়:
(১) দানের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করতে হবে।
(২) দাতা কতৃক দানটি স্বেচ্ছা প্রণোদিতভাবে সম্পাদিত হতে হবে।
(৩) কোন প্রকার বিনিময় মূল্য ব্যতীত দানটি করতে হবে।
(৪) দানকৃত সম্পত্তিটির অস্তিত্ব থাকতে হবে।
(৫) যার বরাবরে দান করা হবে, দানটি গ্রহণ করতে হবে।
(৬) কোন নিদির্ষ্ট ব্যক্তির বরাবরেই সম্পত্তি দান করতে হবে।
(৭) যে ব্যক্তি দান করবেন তাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের যোগ্য হতে হবে।
(৮) আইনত অযোগ্য ব্যক্তি এবং নাবালক ব্যক্তি কতৃক সম্পাদিত দান বৈধ বলে গণ্য হবে না।
দানের ক্ষেত্রে দাতা দানকৃত বিষয়বস্তু হতে তার সমস্ত অধিকার পরিত্যাগ করবেন। অন্যথায়, দানকৃত সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরিত হবেনা। আবার দান দাতা কতৃক স্বেচ্ছা প্রণোদিতভাবে হতে হবে।দান এর মধ্যে জোর-জবরদস্তি,বলপ্রয়োগ, শত্রুতা থাকলে চলবে না।
উল্লেখ্য যে, দাতা কর্তৃক দানটি বিনামূল্যে বা পণবিহীন হতে হবে। কারণ যে হস্তান্তরে কোন বিনিময়মূল্য থাকে তাকে কোনক্রমেই দান বলে গণ্য করা যায় না। আর দানের সম্পত্তি স্থাবর হোক আর অস্থাবরই হোক বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকতে হবে।দানকৃত সম্পত্তিটি দানগ্রহীতা কতৃক গ্রহণ করতে হবে।
উপরন্ত, কোন দান দাতার এবং গ্রহীতার জীবদ্দশায় সম্পাদন করতে হবে এবং গ্রহণ করতে হবে।কারণ কোন ব্যক্তির বরাবরে দান করা হলে যদি দান গ্রহণের পুবেই দানগ্রহীতার মৃত্যু ঘটে, তাহলে অনুরুপ দান সম্পূর্ণ হয় না।মোদ্দাকথা দান সম্পাদনের সময় দাতা ও দানগ্রহীতাকে জীবিত থাকতে হবে।
দাতা এবং দানগ্রহীতাকে সনাক্ত হতে হবে।একটি উদাহরনের মাধ্যমে দান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে: স্বামী তার নিজের এবং স্ত্রীর নামে কিছু অলংকার ব্যাংকে জমা রাখেন এবং ব্যাংককে নিদেশ দেন যে, তাদের মধ্যে যে সবশেষ বেঁচে থাকবেন তিনি অলংকারসমূহ পাবেন। এ দান নয়,কারণ স্বামী অলংকারের উপর তার অধিকার ত্যাগ করেন নাই।
দানপত্র গ্রহীতা যে দানকৃত সম্পত্তিতে মোটেই দখল পাননি, দানপত্র দলিল আদালতে দাখিল করার পরে তা মৌখিক সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ করা যাবে।
রেজিষ্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ১৭ ধারায় দানপত্র রেজিষ্ট্রেশন সম্পকে বলা হয়েছে যে “নিম্নলিখিত দলিলপত্রাদি রেজিষ্ট্রি করিতে হইবে; যদি উহা ঐ জেলায় অবস্থিত সম্পত্তি সম্পকে সম্পাদিত হয় এবং যদি উহা ১৮৬৪ সালের ১৬ নং আইন অথবা ১৮৬৬ সালের রেজিষ্ট্রেশন আইন অথবা ১৮৭১ সালের রেজিষ্ট্রশন আইন অথবা ১৮৭৭ সালের রেজিষ্ট্রেশন আইন কার্যকরী হইবার দিনে বা এর পরে সম্পাদিত হয় :
(ক) স্থাবর সম্পত্তির দানপত্র
উইল ব্যতীত অন্যান্য দলিলপত্র যা একশত টাকা বা তদূধ্ব অথবা কোন স্থাবর সম্পত্তিতে বতমান বা ভবিষ্যত কায়েমী বা সম্ভাব্য কোন অধিকার স্বত্ব বা সুযোগ-সুবিধা জন্মায়, ঘোষণা করে, অর্পণ করে, সীমাবদ্ধ করে বা নি:শেষিত করে।
কখন দান গ্রহণ করতে হবে:
দানকতার্র জীবদ্দশায় এবং সে যখন দান করতে সম্পূর্ণ সক্ষম থাকবে, সে অবস্থায় অনুরুপ হস্তান্তর গ্রহন করতে হবে।দান গ্রহনের পূর্বে দান গ্রহীতার যদি মৃত্যু ঘটে, তাহলে উক্ত দান বাতিল হবে।
দানের প্রকারভেদ:-
মুসলিমদের মধ্যে দান তিন ধরনের হয়ে থাকে।যথা: (১) হেবা অথাত্ সাধারণ দান; (২) হেবা-বিল-এওয়াজ অথাত্ কোন কিছুর বদলে দান; এবং (৩) হেবা বা শরতুল -এওয়াজ অথাত্ প্রতিদিনের শর্তযুক্ত দান।
১) হেবা অর্থাৎ সাধারণ দান: সাধারণভাবে হেবা বলতে শর্তবিহীনভাবে ও স্বেচ্ছাপ্রনোদিত হয়ে বিনিময়মূল্য ছাড়া এক ব্যক্তি কতৃক অন্য ব্যক্তিকে কোন সম্পত্তির হস্তান্তর।
একটি সাধারণ দান বৈধ হওয়ার জন্য আবশ্যকীয় শর্তসমূহ হল এই যে, (এক) দাতা কতৃক দানের বিষয়বস্ত গ্রহীতার বরাবরে হস্তান্তর করবার ইচ্ছা দানের ঘোষণা;(দুই) দান গ্রহীতা কতৃক স্বয়ং অথবা তত্পক্ষে কাহারো দ্বারা দান গ্রহণ ;(তিন)দাতা কর্তৃক গ্রহীতাকে দানের বিষয়বস্তর দখল অর্পণ করা।
যদি উপরোক্ত শর্তগুলো পালন করা হয়,তাহলেই দানটি সম্পূর্ণভাবে বৈধ হবে।মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ আমীর আলীর মতে, বৈধ দানের আবশ্যকীয় শর্তগুলো হলো:(ক) দাতার পক্ষে ইচ্ছার বহি:প্রকাশ (খ) গ্রহীতার পক্ষে পরোক্ষ বা প্রতক্ষ্যভাবে দান গ্রহণ এবং (গ) গ্রহীতা কতৃক প্রকৃতভাবে বা অনুমানসিদ্ধভাবে দানের বিষয়বস্ত গ্রহণ করা।
এর অর্থ হলো যে, দাতা কতৃক দানের বিষয়বস্তকে গ্রহীতার কাছে অর্পণ করত: নিজে স্বত্ব ও দখলত্যাগী হবার জন্য একটি সত্ মনোভাব থাকতে হবে এবং সেঅনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন হতে হবে।
হেবা ও দানের মধ্যে প্রকৃতিগত কোন পাথর্ক্য নেই।কিন্তু পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য পরিদৃষ্টি হয়।যেমন: হেবা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বেলায় প্রয়োজন নয়।কিন্তু দানটি সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ধারা ১২৯ এ বিষয়ে উল্লেখিত হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিধান মতে একটি দান লিখিত,সাক্ষী কতৃক সমথির্ত ও রেজিষ্ট্রীকৃত হতে হবে।তাত্ক্ষণিক দখল না করলে ও চলবে।কিন্তু মুসলিম আইনে হেবার ক্ষেত্রে মোখিক বা লিখিতভাবে দানের বিষয়বস্তু দাতা কর্তৃক দান গ্রহীতার বরাবরে দখল করলেই হয়।
হেবা বিল এওয়াজ: স্নেহ, ভালোবাসা,মমতা,শ্রদ্ধা ইত্যাদি মানবীয় গুণাবলী একজন মানুষকে হেবা বা দান কায সম্পাদনে উদ্ধুদ্ধ করে। আর যখনই একজন মানুষ অপর একজন মানুষের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা আপ্ললিত হয়ে তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি বিনা শতে অর্পণ করে তখন স্বভাবতই উক্ত দানগ্রহীতা দাতার মহানুভবতায় বেশী মুগ্ধ হয়ে দাতাকে খুশী করার জন্য কিছু সামর্থানুযায়ী উপঢৌকণ বা উপহার প্রদান করে।মূলত এ প্রত্যয় থেকেই হেবা বিল এওয়াজের উন্মেষ।
হেবা বিল এওয়াজ অর্থ হলো কোন কিছু প্রতিদানের বিনিময়ে দান। সুতরাং দাতা যদি কোন সম্পত্তি দান করে দানগ্রহীতার কাছ হতে এর বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করে, তখন এধরনের দানকে মুসলিম আইন মোতাবেক হেবা-বিল -এওয়াজ নামে অভিহিত করা হয়।হেবা বিল এওয়াজ দুটি শব্দ।হেবা +এওয়াজ, হেবা অর্থ দান এবং এওয়াজ অর্থ বিনিময়।অতএব হেবা বিল এওয়াজ অর্থ বিনিময় দান।
ইসলামী আইনের ধারণা অনুসারে ‘হিবা-বিল-এওয়াজ’ দানের প্রথম দুটি কাজের সমন্বয়ে গঠিত হয়, অথাত্ দুই ব্যক্তির মধ্যে নিদিষ্ট সম্পত্তির পারস্পরিক দান,যার প্রত্যেকে বিকল্পভাবে একটি দানের দাতা এবং অন্যটির মধ্যে দানগ্রহীতা থাকেন।উভয় দানই সাধারণ দান, কিন্তু একবার দ্বিতীয় দানটি প্রথমটির ‘এওয়াজ’ হিসেবে প্রথমটির দাতা কর্তৃক গৃহীত হয়ে গেলে উভয় দানই অপ্রত্যাহারযোগ্য হয়ে যাবে।

তবে হেবা-বিল-এওয়াজের দুটি উপাদান এর সমন্বয়ে গঠিত হয়:
ক) দাতা কর্তৃক দান গ্রহীতাকে যে দান করেছে তার বিনিময়ে দান গ্রহীতা কর্তৃক দাতাকে কিছু না কিছু প্রদান ।
খ) দাতা-দানের বস্তু দানগ্রহীতাকে অর্পনান্তে তার অধিকার থেকে নি:স্বত্ব হওয়ার সদিচ্ছা পোষণ।
সুতরাং দান + প্রতিদান = হেবা বিল এওয়াজ কখন দান গ্রহণ করতে হয়: দাতার জীবদ্দশায় এবং সে যখন দান করতে সম্পূর্ণ সক্ষম সেই অবস্থায় অনুরুপ হস্তান্তর গ্রহণ করতে হয়।দান গ্রহণের পূবে দানগ্রহীতার যদি মৃত্যু ঘটে, তাহলে উক্ত দান বাতিল হয়।
হেবা বিল এওয়াজের অপরিহার্য উপাদান:
হেবা-বিল -এওয়াজের উপরোক্ত সংজ্ঞাদৃষ্টে এর অপরিহায উপাদান সহজেই উপলব্ধি করা যায়।যেমন: প্রথমত: দাতা কর্তৃক দানগ্রহীতাকে বিশুদ্ধ চিত্তে নি:স্বত্ব ভাবে কোন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অর্পণের প্রত্যাশা পোষণ। দ্বিতীয়ত :দান গ্রহীতা কর্তৃক দাতা উক্ত দানের জন্য কিছু বিনিময় প্রদান। তৃতীয়ত: তাত্ক্ষণিক হস্তান্তর হতে ও পারে বা নাও হতে পারে।
চতুর্থত :বিনিময়ের বিষয়টি কোন চুক্তির ফলশ্রুতি নয়।দান গ্রহীতার অধিকরের বিষয়। অথাত্ এটি তার স্বাধীন ইচ্ছার বিষয়।
পঞ্চমত:প্রতিদানের বিষয়টি পযাপ্ত হবে কি, হবে না তা গুরত্বপূর্ণ নয়।
প্রথম দিকের ইসলামী আইনবিদগন এর সংজ্ঞা ও ব্যাখা দান করেছেন।তাঁদের মতে হেবা-বিল এওয়াজ অনুশীলনে দুটি দানের অস্তিত্ব পরিদৃষ্ট হয়।একটি দাতাকর্তৃক দানগ্রহীতাকে এবং অপরটি দানগ্রহীতা কর্তৃক দাতাকে।এহেন পারস্পরিক দানের ক্ষেত্রে কোনরুপ শর্ত থাকে না, থাকে না কোন বিনিময় প্রত্যাশা।উভয় উভয়কে ভালোবাসার বস্তুগত নিদর্শন স্বরুপ একে অপরকে প্রদান করে ।
এধরনের হেবাতে পরস্পরে যা দান করা হয় তার তুলনামূলক মাত্রা বিবেচ্য নয়।হতে পারে তা এক লক্ষ টাকা সম্পদের স্থলে একটি জায়নামাজ বা এক কপি কোরআন শরীফ।এ ধরনের দান বিশুদ্ধ দান। এটি দান আইন কর্তৃক নিবাহ হয়।দখল অর্পণ আপাত: না হলে ও চলে।এক্ষেত্রে একটি দান প্রথম অনুষ্ঠিত হয়।তারপর অপরটি এবং দ্বিতীয় দানটি ইচ্ছা নির্ভর। তবে দ্বিতীয় দানটি গ্রহণের পর কোন দানই আর প্রত্যাহার করা যায়না।
সম্প্রতিককালের কিছু বিশিষ্ট নজীর এই সম্পকে যথেষ্ট আলোকপাত করেছেন।যে কোন মুসলিম তার জীবনকালে তার সমগ্র সম্পত্তি বা কিছু পরিমাণ সম্পত্তি হেবা করে দিতে পারে।যার উপর ভিত্তি করে সম্পত্তি দাবী করে তার হেবার আবশ্যিক প্রমাণসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে বাধ্য ।
হেবা-বিল-এওয়াজের প্রশ্ন উঠলে বিবেচনা করতে হবে দাতার মনের অবস্থা যদি প্রতিদানের বিনিময়ে তার সম্পত্তি হস্তান্তর করিতে মনস্থ করিতে থাকে।তবেই সেই সম্পত্তি হেবা-বিল এওয়াজ হবে।হেবা-বিল এওয়াজের মধ্যে দখলার্পণ আবশ্যক।
দ্বিতীয় হেবার দাতা হেবা নাও করতে পারে।প্রথম হেবা সম্পূর্ণ করতে হলে তাই দখলার্পণ আবশ্যক।দ্বিতীয় হেবা ও একটি সাধারণ হেবা কিন্তু প্রথম হেবাই তার কারণ।দ্বিতীয় হেবা প্রথম হেবার দাতা যদি গ্রহণ করে তবে উভয হেবাই অপ্রত্যাহারযোগ্য হয়ে যায়।
হেবা-বিল এওয়াজের মধ্যে যদি এওয়াজ না থাকে অথাত্ প্রতিদান না থাকে তবে সেই হেবাকে, হেবা-বিল এওয়াজ বলা যায়না।অবশ্য হেবা-বিল এওয়াজে, এওয়াজ বা প্রতিদানের কম হলে কিছু আসে যায় না।এওয়াজ অতি সামান্য ও হতে পারে।
আধুনিক দানটি শর্তযুক্ত।দাতা গ্রহীতাকে দানের বস্তু দান করবে এবং তার বিনিময়ে দান গ্রহীতা ও দাতাকে কিছু না কিছু দান করবে।এতে যদি দান গ্রহীতা ব্যর্থ হয়,তাহলে দাতাকে কিছু না কিছু দান করবে।এতে যদি দানগ্রহীতা ব্যর্থ হয় তাহলে দানটি বাতিল হয়ে যাবে।এটিও স্মরণযোগ্য এ বিনিময় গতরের খাটনী বা শারীরিক পরিশ্রম হলে হবে না।এতে সম্পদের বিনিময় থাকতে হবে।
বৈশিষ্টাবলী:
প্রথমটি অনুষ্ঠিত হলে পরেরটি অনুষ্ঠিত হতে হবে।আর না হলে পূবোর্ক্তটি অথাত্ আগেরটি বাতিল হয়ে যাবে।এখানে দুটি দান পরস্পর নিভর্রশীল।তাই এদেরকে পৃথক করে ভাবা যায় না।পরেরটি অনুষ্ঠিত হলে তা অপ্রত্যাহারযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
হেবা বা কারত-উল-এওয়াজ:
যেক্ষেত্রে দাতা কাউকে কিছু দানকালে এর প্রতিদানের শর্তসহ তা কাযর্করী করে অথাত্ যেক্ষেত্রে প্রতিদানের প্রতিশ্রুতির শর্তসহ কোন হেবা কাযর্করী হয়,তখন তাকে হেবা বা কারত উল -এওয়াজের ক্ষেত্রে দখল অর্পণ আবশ্যক এবং দানটি রদযোগ্য।তার দান গ্রহীতা দাতাকে প্রদান করলে দানটি আর রদযোগ্য থাকবেনা।
বাংলা পাক-ভারত উপমহাদেশে এর অনুশীলন ক্ষীন হয়।এটি এক প্রকার বিনিময় চুক্তি।এই উপমহাদেশে হিবাবিল এওয়াজকে বিক্রয়ের তুল্য।সুতরাং দখলার্পণ আবশ্যক।হেবা-বিল-এওয়াজের প্রশ্ন উঠলে বিবেচনা করতে হবে দাতার মনের অবস্থা যদি প্রতিদানের বিনিময়ে তার সম্পত্তি হস্তান্তর করিতে মনস্থ করিতে থাকে।তবেই সেই সম্পত্তি হেবা-বিল এওয়াজ হবে।হেবা-বিল এওয়াজের মধ্যে দখলার্পণ আবশ্যক।
হেবা -বিল এওয়াজের জন্য প্রতিদান:
যে সম্পত্তি দান করা হলো,এরই অংশবিশেষ ফেরত দিলে, মুসলিম আইনে ‘এওয়াজ’হিসেবে গণ্য করা হবে না।’এওয়াজ’ বলতে এমন কিছু বুঝাবে যা আলাদাভাবে শুধুমাত্র দান গ্রহীতারই এবং যা কেবল দানের ফলশ্রুতিতে ব্যতীত দাতার হাতে আসতে পারতোনা।কিন্তু প্রতিদান বা এওয়াজের পযার্প্ততা কোন গুরত্বপূর্ণ বিষয় নয়।যে সম্পত্তি দান করা হয়েছে, এর মূল্যের তুলনায় এওয়াজ অতি নগন্য মূল্যের হলেও তা সম্পূণৃভাবে বৈধ হবে।
এমন কি একটি আংটি ও যথেষ্ঠ প্রতিদানস্বরুপ হতে পারে, কিন্তু যে পরিমাণের প্রতিদান হোক না কেন , এটি অবশ্যই প্রকৃত এবং আন্তরিকভাবে প্রদান করতে হবে। এই উপ-মহাদেশের বিভিন্ন দেশে এওয়াজের প্রকৃতিতে বিক্রয় মূল্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রথা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সে এওয়াজ বা প্রতিদান প্রায়শই পবিত্র কোরআনের একখানা কপি এবং তসবিহ অখবা জায়-ই -নামাজ অথবা অত্যন্ত নগন্য মূল্যের অন্য কোন সম্পত্তি অথবা এমন কোন সম্পত্তি হয়ে থাকে , যার আদৌ কোন মূল্য নাই এবং এধরনের লেনদেন বৈধ।
দানের জন্য এধরনের প্রতিদান বিভিন্ন রকম হতে পারে।শুধু আথিক প্রতিদানই নয়, বিবাহ-শাদী ও কোন দানের প্রতিদান হতে পারে।যদি কোন প্রস্তাবিত বিবাহ কোন দানের প্রতিদান হয়, তবে তা বৈধ হবে এবং বিবাহ অনুষ্ঠানের পর সেই দান অপ্রত্যাহারযোগ্য হয়ে পারবে।বিবাহ সম্পন্ন হওয়ায় দাতা তার দানের জন্য প্রতিদান পেয়ে যান, যার অতিরিক্ত শর্ত যে, দাতা এবং গ্রহীতা একত্রে স্বামী -স্ত্রী হিসেবে বসবাস চালু রাখবেন।
যদি দেখা যায় যে,’এওয়াজ’ প্রদান করা হয়নি ,তবে দানটি হেবা-বিল-এওয়াজ নয় এবং তা আইনের চোখে অবৈধ হবে।যদি প্রতিদানের অভাবের জন্য কোন দলিল হেবা-বিল-এওয়াজ হিসেবে না টিকে, তবে দাতার ইচ্ছা এবং বৈধ দানের অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকে, তবে একে একটি সাধারণ হেবা বা দান হিসেবে গণ্য করা যাবে।
কোন নাবালকের প্রতি হেবা-বিল -এওয়াজ করা হলে সে যদি দানটির জন্য ‘এওয়াজ’ প্রদান করে , তবে সে তার পক্ষে লেনদেন সম্পন্ন করেছে এবং এইক্ষেত্রে তার নাবালকত্ব স্বত্বে ও তার দান সম্পূর্ণ এবং বৈধ।কোনরকম সেবা বা কাজকে দানের জন্য এওয়াজ হিসেবে গণ্য করতে হলে এর অবশ্যই একটি মূল্য থাকতে হবে, অন্যথায় এটি সাধারণ দান হিসেবে গণ্য হবে।
হেবা বি শর্ত -উল -এওয়াজ:
যখন বিনিময়ের (এওয়াজ) চুক্তিতে (শর্ত)হেবা করা হয় তখন সেই আদান -প্রদানকে হেবা-বি শাত- উল এওয়াজ বলে।যে এওয়াজ সম্পকে শর্ত করা হয় তা নিধার্রিত বা অনিধারিত উভয় হতে পারে।এধরনের দানের ক্ষেত্রে এওয়াজের সাথে সংশ্লিষ্ট দানের সব শতাদিসহ তা কাযকরী হয় এবং তাকে বৈধ করতে হলে দখল অর্পণ প্রয়োজন এবং উভয় পক্ষই দখল অর্পণের আগে তা প্রত্যাহার করতে পারে কিন্ত উভয় দানের দখল অর্পণের পর বিক্রয়ের মত তা কাযকরী হবে।
হেবা -বি -শর্ত-উল এওয়াজ সম্পকে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নজীর: দলিলের মধ্যে দাতা যেখানে স্বীকার করেছে যে,সম্পত্তির দখলার্পণ গ্রহীতার বরাবরে করা হয়েছে। সেই স্বীকৃতি দাতার উত্তরাধিকারীর উপর বাধ্যকর।হেবা-বি-শত-উল এওয়াজের দলিলের মধ্যে এধরনের স্বীকৃতি উত্তরাধিকারীর উপর বাধ্যকর হলে ও দখল সম্পকে চুড়ান্ত প্রমাণ নয়।
বাংলাদেশে হেবা-বিল-এওয়াজের যথেষ্ঠ প্রচলন দেখা যায়।এক জিলদ কোরআন শরীফ, একখানা জায়নামাজ ও একছড়া তসবীহের বদলে মূল্যবান ভূ-সম্পত্তি দান করার রেওয়াজ বাংলাদেশে রয়েছে।বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে দানের সম্পকে নিম্নবণিত বিধানসমূহ পাওয়া যায়।
দান হচ্ছে স্থাবর বা অস্থাবর বিদ্যমান সম্পত্তির দাতা কর্তৃক প্রদত্ত এবং দান গ্রহীতা কর্তৃক গৃহীত স্বেচ্ছামূলক ও পনহীন হস্তান্তর।দাতার জীবনকালে এবং তার দান ক্ষমতা অব্যাহত থাকা-কালে দান গ্রহণীয় অন্যথায় দান অসিদ্ধ।দান যেহেতু একটি হস্তান্তর সেহেতু হস্তান্তরের সব আইন দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
একটা আদান-প্রদান দান কি না, তা বিচার করতে হলে সমগ্র পরিস্থিতিকে বিবেচনার অধিকারে আনতে হয়।পক্ষবৃন্দ, ঐ আদান-প্রদানের সময় কি অভিপ্রায় বা ইচ্ছা মনে পোষণ করেছিলেন তা নিধারণ করে তবে তার প্রকৃতি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় ।দানের বিষয়বস্তু বিদ্যমান থাকা আবশ্যক।যা ভবিষ্যতে অধিকারে আসবে, এমন বস্তু সম্পত্তি দান করা যায়না।দানকে স্বেচ্ছামূলক হতে হবে, অন্যথায় তা অসিদ্ধ।
একটা আপাত: প্রতীয়মান দান বাস্তবিক পক্ষে আইনানুগ যথাথ দান কি না, তা নিধারণ করতে হলে দুটি বিষয়ে প্রাধান্য দিতে হবে :
প্রথমত: দাতা তার কাজের মর্ম দানের সময় বুঝতে সক্ষম ছিলেন কি না। দ্বিতীয়ত, দেখতে হবে দলিলে যা লিখিত হয়েছিল তা তিনি পরিস্কার বুঝতে পেরেছিলেন কি না।দাতা যদি পদার্নশীল স্ত্রীলোক হন কিংবা অশক্ত বৃদ্ধ হন, তবে দানগ্রহীতার উপর দানের যথার্থতা প্রমাণ করবার বিশেষ দায়িত্ব বতার্য়।
দান গ্রহীতাকে নিদির্ষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ হতে হবে।জনসাধারণের বরাবরে দান অসিদ্ধ।দানগ্রহীতাকে দান গ্রহণ করতে হবে।
উপরোক্ত দানের পদ্ধতি কি:
স্থাবর সম্পত্তি রেজিষ্ট্রীকৃত দলিলের মাধ্যমে দান করতে হয়।ঐ দলিল দাতার দ্বারা বা তার পক্ষে কার ও স্বাক্ষরিত এবং অন্যান্য দুজন সাক্ষী দ্বারা সত্যায়িত হতে হবে।অস্থাবর সম্পত্তি এই ধরনের রেজিষ্ট্রী দলিল কিংবা দখলার্পণ দ্বারা দান করা যায়।
দুই বা ততোধিক ব্যক্তির কাছে দান করা হলে যে ব্যক্তি দান গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন, তার অংশ দানের বহিভূর্ত থাকবে।দান সবর্দা ব্যক্তির নিকট করা হয় এবং গ্রহণ এর একটি আবশ্যকীয় উপাদান।গ্রহীতা না হলে দান অকাযর্কর।
উপরোক্ত দান স্থগিত বা রহিত করা যায় কি?
যখন দাতা এবং দান গ্রহীতা একমত হন, তখন করা যায়।একমত হতে হবে এর বিশেষ ঘটনা ঘটা সম্পর্কে এবং ঐ ঘটনা ঘটা দাতার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হবে না।দান রহিতের শর্ত যদি দাতার ইচ্ছাভিত্তিক হয়,তবে ঐ দান অবৈধ।যে কারণে চুক্তি নাকচ করা যায়, সে কারণে দান ও নাকচ করা যায়।অন্যভাবে দান রহিত করা যায় না।
দান করার অর্থ সম্পূর্ণভাবে দেওয়া।সুতরাং যে দান দাতার ইচ্ছায় ফিরিয়ে নেওয়া যায়, তা দান নয়।দানের পর দাতা দানকৃত বস্তু নিজের ইচ্ছায় ফেরত পেতে পারেননা।
দায়যুক্ত দান সম্পকে আইনের কি বিধান?
যেখানে দানকৃত সম্পত্তি একাধিক এবং যার একটা মুক্ত ,অন্যটা দায়যুক্ত।যেখানে দায়যুক্ত, সেখানে দান গ্রহীতা সমগ্র সম্পত্তি গ্রহণ না করলে দান অসিদ্ধ।তবে দানকৃত সম্পত্তিগুলো একাধিক হস্তান্তরের বিষয়বস্তু হলে একটি বাদ দিয়ে অপরটি গ্রহণ বৈধ।যার চুক্তি করবার ক্ষমতা নেই, তিনি দান গ্রহণ করতে পারেন না।
যেক্ষেত্রে দাতা তার সমগ্র সম্পত্তি দান করেন, সে ক্ষেত্রে দানগ্রহীতা দাতার সমস্ত অধিকার ও দায়িত্ব গ্রহন করতে বাধ্যথাকেন।দান সম্বন্ধীয় এই বিধানসমূহ মুসলিমদের দানের উপর অপ্রযোজ্য।
মোহরানা ঋণের পরিবতে হেবা-বিল এওয়াজ: স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মোহরানা সংক্রান্ত হেবা-বিল-এওয়াজ আইন সন্মত।স্ত্রী কোন প্রতিদান ছাড়াই স্বামীর বকেয়া দেন মোহরের পাওনা টাকা দান করে দেয়।স্ত্রী এর প্রতিদান স্বরুপ পৃথকভাবে স্বামীকে কোন সম্পদ দান করলে তা হেবা -বিল -এওয়াজ হিসেবে বিবেচিত হবে।এটি দলিল মূলে ছেড়ে দেওয়া হলে তাও দান আইন মোতাবেক হেবা -বিল-এওয়াজ হিসেবে গ্রাহ্য হবে।
মো: হাবিবুল হক
এডভোকেট
জজ কোর্ট, ঢাকা
মোবাইল নং: ০১৮১৩৬১৩৬৭৯
Discussion about this post