মোকদ্দমা স্থানান্তরের বিষয়ে যাবতীয় নিয়মাবলী দেওয়ানী কার্যবিধি ,১৯০৮ এর ২২ হতে ২৪ ধারাতে বর্ণিত আছে। ২২ ধারাতে যা বলা আছে তার সারমর্ম এই যে, যখন কোন মামলা দুই বা ততোধিক আদালতের যে কোন একটিতে দায়ের করা চলে, এবং মামলাটি তন্মধ্যে একটি আদালতে দায়ের করা হয়, তখন বিবাদী অপর পক্ষকে নোটিশ দিয়ে বিচার্য বিষয় নির্ধারণের সময় অথবা পূর্বে মামলাটি অপর একটি আদালতে স্থানান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট জজ কোর্ট অথবা হাইকোর্ট আবেদন পাওয়ার পর উভয় পক্ষের বক্তব্য শ্রবণ করে কোন আদালতে মামলার বিচার হবে তা স্থির করে দেবেন। ২৩ ধারাতে বলা আছে, যখন এখতিয়ার সম্পন্ন একাধিক আদালত একই আপীল আদালতের অধীন হয়, তখন সেই আপীল আদালতে ২২ ধারা অনুযায়ী দরখাস্ত দাখিল করতে হবে। এরূপ আদালতগুলি একাধিক আপীল আদালতের কিন্তু একই হাইকোর্টের অধীন হলে, দরখাস্ত হাইকোর্ট ডিভিশনে পেশ করতে হবে। অত্র আইনের ১৬ ধারানুযায়ী কতকগুলি মামলা বাদী ইচ্ছানুযায়ী একাধিক আদালতের যে কোন একটিতে দাখিল করতে পারে। তখন বিবাদী উপযুক্ত কারণ দর্শে অন্য এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে স্থানান্তরের জন্য বর্ণিত উপায়ে দরখাস্ত করতে পারবে।
উদাহরণ : রহিম, করিম এবং অন্যান্য কতিপয় শরিকের বিরুদ্ধে একটি বাটোয়ারা মোকদ্দমা করতে ইচ্ছুক। বাটোয়ারা মামলার কতক জমি পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালতের এলাকাধীন এবং অবশিষ্ট জমি পার্শ্ববর্তী সহকারী জজ আদালতের এলাকাধীন হলে যে কোন একটিতে দায়ের হতে পারে। রহিম তার ইচ্ছানুযায়ী বাটোয়ারা মামলাটি পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালতে দাখিল করল। করিম এবং অন্যান্য শরিক বিবাদীদের ইচ্ছায় মামলাটি সদর সহকারী জজ আদালতে স্থানান্তরিত হোক, এমতাবস্থায় করিম রাজশাহী জেলা জজ আদালতে এই মর্মে দরখাস্ত দিতে পারে। পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালত রাজশাহী জেলা জজের অধীন হওয়ায় রাজশাহী জেলা জজ বাদী পক্ষকে নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে যথোপযুক্ত আদেশ দিতে পারবেন। কি অবস্থাতে এই জাতীয় মামলা স্থানান্তরের দরখাস্ত মঞ্জুর অথবা না মঞ্জুর হবে তার কোন নির্দেশ অত্র আইনে নেই। অতএব এই বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে জজ আদালতের সুবিবেচনার উপর নির্ভর করতে হবে। উভয় পক্ষের সুবিধা অসুবিধার কথা শ্রবণ করে আদালত যে আদেশ দেওয়া ন্যায়সঙ্গত মনে করবেন তাই দেবেন।
মামলা স্থানান্তরের বা প্রত্যাহারের সাধারণ ক্ষমতা

এই বিষয়ে যাবতীয় জ্ঞাতব্য বিষয় অত্র আইনের ২৪ ধারাতে বর্ণিত আছে। তাতে বলা আছে, মামলার যে কোন পক্ষের আবেদন ক্রমে সকল পক্ষকে নোটিশ দিয়ে এবং তাদের কোন বক্তব্য থাকলে, তা শ্রবন করে অথবা কোন নোটিশ না দিয়ে স্বতঃ প্রবৃত্ত হয়ে হাইকোর্ট বা জেলা জজ আদালত যে কোন সময়ঃ
(ক) তার নিকট বিচারাধীন কোন মামলা, আপীল বা অপর কার্যক্রম ( Other Proceedings), তার অধীনস্থ কোন এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে বিচার বা নিষ্পত্তির জন্য স্থানান্তরিত করতে পারেন; অথবা
(খ) উহার অধীনস্থ কোন আদালত হতে কোন মামলা, আপীল বা অপর কার্যক্রম প্রত্যাহার করতে পারেন এবং তার বিচার বা নিষ্পত্তি করতে পারেন, অথবা অধীনস্থ কোন এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে বিচার বা নিষ্পত্তির জন্য স্থানান্তরিত করতে পারেন, অথবা যে আদালত হতে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল, পুনরায় সেই আদালতে বিচার বা নিষ্পত্তির জন্য প্রেরণ করতে পারেন।
উক্ত বিধান অনুযায়ী কোন মামলা স্থানান্তরিত বা প্রত্যাহৃত হয়ে থাকলে পরে যে আদালতে তার বিচার হয়, সেই আদালত স্থানান্তরের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশ সাপেক্ষে উহার পুনর্বিচার করতে পারেন, বা যে পর্যায়ে তা স্থানান্তর বা প্রত্যাহার করা হয়েছিল, সেই পর্যায় হতে বিচার শুরু করতে পারেন। এই ধারার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ও সহকারী জজের আদালতকে জেলা জজের অধীন বলে গণ্য করতে হবে।
সহকারী জজ আদালত এবং অন্যান্য নিম্ন আদালতের অসম্মতিতে জেলা জজ আদালতে যে সমস্ত আপীল দায়ের হয়, সেইগুলি জেলা জজ আদালত প্রায় প্রতিনিয়ত অন্যান্য অধীনস্থ ক্ষমতাসম্পন্ন আপীল আদালতে বিচারে নিষ্পত্তির জন্য প্রেরণ করে থাকেন এবং প্রয়োজনবোধে এইগুলি প্রত্যাহার করে অন্য আপীল আদালতে বিচারের জন্য প্রেরণ করেন। এ ছাড়াও পক্ষদের কোন আপত্তি থাকলেও আপত্তিকারী পক্ষ মামলা স্থানান্তরের জন্য জেলা জজ আদালতে এই ধারানুযায়ী দরখাস্ত দিতে পারে।
উদাহরণ: করিম রহিমের বিরুদ্ধে পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে এবং এই মামলা পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালতেই বিচার্য। মামলার শুনানি আরম্ভ হয়েছে। বাদী পক্ষের কতক সাক্ষীর জবানবন্দী এবং জেরাও হয়েছে। বিবাদী পক্ষের সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা হতে বাকী। তদবস্থায় আদালতের আচরণে ও মন্তব্যে বিবাদী পক্ষের এই দৃঢ় ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে আদালত বাদীর পক্ষাশ্রিত হয়ে গিয়েছেন এবং তথায় বিচার হলে বিবাদীর সুবিচার পাওয়ার আশা নেই। তখন বিবাদী পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালতে এই মর্মে দরখাস্ত দিতে পারে যে, সে জেলা জজ আদালতে এই মামলা অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য দরখাস্ত দেবে এবং সেজন্য তাকে যেন ১০ দিনের সময় দেওয়া হয়। পবা উপজেলা সহকারী জজ আদালত এই অবস্থায় মামলার শুনানি স্থগিত রেখে বিবাদীকে অন্যত্র মামলা স্থানান্তরের জন্য জজ আদালতে দরখাস্ত দেওয়ার সুযোগ দিতে পারেন অথবা বিবাদীর আবেদন অগ্রাহ্য করে মামলা আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে পারেন।
যদি মামলার শুনানি স্থগিত রেখে ২৪ ধারানুযায়ী মামলা স্থানান্তরের জন্য জজ আদালতে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়, এবং জজ আদালত যদি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে এই মামলা অন্য কোন সহকারী জজ আদালতে স্থানান্তরের আদেশ দেন, তবে জজ আদালতের আদেশ সাপেক্ষে এই মামলা পবা সহকারী জজ আদালতে যে পর্যন্ত শুনানি হয়েছিল তার পর হতে শুনানি হতে পারবে, অথবা জজ আদালত যদি উপযুক্ত মনে করেন, তবে নতুন আদালতকে পুনরায় নতুনভাবে বাদী পক্ষের সাক্ষ্য নিয়ে মামলা বিচার করবার আদেশও দিতে পারেন। সাধারণত কোন মামলা আপীল বা অপর কার্যক্রম স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিলে এই ধারার সাহায্য নেওয়া হয়। কখন এই ধারানুযায়ী স্থানান্তরের দরখাস্ত দেওয়া যেতে পারে তার কোন নির্দেশ এই ধারাতে নেই। উপরের উদাহরণে আমরা দেখতে পাই মামলার শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ শুনানির মধ্যভাগে মামলা স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়। কি কারণে মামলা স্থানান্তরের আদেশ দেওয়া যেতে পারে তারও কোন নির্দেশ এই ধারাতে নেই। অতএব ন্যায়বান জজ আদালত ন্যায় বিচারের প্রয়োজনে উভয় পক্ষের বক্তব্য শ্রবণ করে তিনি যা উপযুক্ত এবং সুবিবেচনাসম্মত মনে করবেন সেই রকম আদেশই দিতে পারবেন।
লেখকঃ ল ফর ন্যাশনস, ইমেইলঃ lawfornations.abm@gmail.com
Discussion about this post