অ্যাডভোকেট সোয়েব রহমান
মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ একটি পদ্ধতিগত আইন। এ আইনটি প্রণীত হলেও এ আইনটি নিয়ে এ যাবৎ ব্যাখ্যামূলক কোন গ্রন্থ রচিত হয়নি। তাছাড়া, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারভুক্ত অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তাগণ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। এজন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কার্যক্রমকে আরও প্রয়োগসিদ্ধ, দক্ষ, নির্ভুল ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে একটি তাৎক্ষণিক বরাত-সূত্র (ready reference) হিসেবে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর একটি নির্দেশিকা প্রণয়নের আব্যশকতা দীর্ঘদিন থেকে অনুভূত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার মোবাইল কোর্ট/ভ্রাম্যমান আদালত নির্দেশিকাটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
এই নির্দেশিকাটিতে মোট ১২টি অধ্যায় রয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ে কয়েকটি ভাগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ম অধ্যায়ের বর্ণিত “মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে করণীয় ও বর্জনীয় নির্দেশিকা তুলে ধরা হয়েছে”।
মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে করণীয় ও বর্জনীয়:
(১) মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ ও এর তফসিলভুক্ত আইনসমূহ সম্পর্কে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সম্যক ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে সংশ্লিষ্ট আইনের বই সঙ্গে রাখা যেতে পারে।
(২) মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিল-বহির্ভূত কোন অপরাধে কোন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করা যাবে না।
(৩) নৈর্ব্যক্তিকভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। শাস্তি প্রদান করা হলেও শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি যাতে উপলব্ধি করতে পারে যে, তার প্রতি অন্যায়ভাবে দণ্ড আরোপ করা হয়নি ।
(৪) মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে অপরাধ সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হয়নি এমন অভিযোগে কোন ব্যক্তিকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট বিচারার্থে হাজির করা হলেও উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে মামলাটি এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রেরণ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করা যাবে না।
(৫) মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অভিযোগ গঠন করার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার করলে তার স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৪ ধারা এবং ১৬৪ ধারার বিধান এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অনুসরণ করার আবশ্যকতা নাই এবং ফৌজদারি কার্যবিধির নির্ধারিত কোন ফর্ম ব্যবহার করারও প্রয়োজন নাই। এক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের নাম এবং মামলা নম্বর, তারিখ, বাদী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম এবং মামলার ধারা উল্লেখপূর্বক সাদা কাগজে অভিযুক্ত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা এবং যতদূর সম্ভব অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজ ভাষায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তি উপস্থিত দু’জন সাক্ষীর সম্মুখে ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করবেন এবং এতে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সাক্ষীগণের স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন। এছাড়াও স্বীকারোক্তি যে কাগজে লেখা হয়েছে তাতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিজে স্বাক্ষর করবেন এবং তাঁর দাপ্তরিক সিলমোহর ব্যবহার করবেন।
(৬) সাজা পরোয়ানায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নাম, পদবি ও স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং সিলমোহর ব্যবহার করতে হবে।
(৭) অর্থদণ্ড আদায়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত রশিদের সকল কলাম যথাযথভাবে পূরণ করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট স্বাক্ষর করবেন এবং নিজের নাম ও পদবি সংবলিত সিলমোহর ব্যবহার করবেন। তিনি ঘটনাস্থলে পূরণকৃত রশিদের প্রথম কপি তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রদান করবেন। অর্থদণ্ড/জরিমানা আদায়ের প্রমাণস্বরুপ কার্বন কপির অপর পৃষ্ঠায় দণ্ডিত ব্যক্তির স্বাক্ষর কিংবা ক্ষেত্রমতে টিপসহি রাখা যেতে পারে। কার্বন কপি হেফাজতে রাখার জন্য তিনি পেশকারকে নির্দেশ দেবেন। সেই সঙ্গে জরিমানা আদায়ের রশিদ নম্বর ও তারিখ আদেশপত্রের পার্শ্বে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে।
(৮) কিছু অপরাধের দণ্ড ও দণ্ডের পরিমাণ উদ্ধারকৃত আলামতের পরিমাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯ ধারার উপধারা (১)-এ বর্ণিত টেবিলের ক্রমিক নম্বর ৭(ক) অনুযায়ী মাদকদ্রব্যের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ৫ কেজি হলে অন্যূন ৬ মাস এবং অনূর্ধ্ব ৩ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে। এ ধারায় দণ্ড দিতে গেলে গাঁজা উদ্ধার ও জব্দ তালিকা থাকা জরুরি। কারণ, এটি মালামাল উদ্ধারের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
(৯) যে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দণ্ডসীমা উল্লেখ রয়েছে, সেক্ষেত্রে উক্ত সীমার মধ্যেই দণ্ড আরোপ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ- কোন ধারায় সাজা ‘অন্যূন ৩ মাস এবং অনূর্ধ্ব ১ বৎসর’ উল্লেখ থাকলে ৩ মাসের নিচে সাজা দেওয়া যাবে না। অনুরূপভাবে ০১ (এক) বছরের ঊর্ধ্বেও সাজা দেওয়া যাবে না।
(১০) কোন আইনের ধারায় শুধু ‘অনূর্ধ্ব ১ বৎসর কারাদণ্ড (which may extend to one year)’ কথাটি উল্লেখ রয়েছে, সেক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কমপক্ষে ০১ (এক) দিন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ০১ (এক) বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।
(১১) মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯- এর তফসিলভুক্ত বেশ কিছু আইনের অপরাধ আমলে নেওয়া এবং দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটিং এজেন্সি কর্তৃক আলামতের নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করতে হয়। এজন্য এসব আইনের অধীনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার পূর্বেই আলামত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণাদি (যেমন-formalin kit) সহকারে উপস্থিত থাকতে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটিং এজেন্সিকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়ে পত্র প্রদান করতে পারেন।
(১২) মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯- এর তফসিলভুক্ত আইনে যে সংস্থাকে মামলা দায়ের বা প্রসিকিউশন দাখিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সে সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ ব্যতীত অন্য কোন সংস্থার দাখিলকৃত প্রসিকিউশন মামলা আমলে নেওয়ার সুযোগ নাই। তবে, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে অপরাধ সংঘঠিত বা উদ্ঘাটিত হলে তিনি নিজে মামলা আমলে নিতে পারবেন।
(১৩) ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আপীল দায়ের করা হলে আপীল আদালত দণ্ডাদেশ প্রদানকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ফিরিস্তি করে আপীল আদালতে প্রেরণের নির্দেশ দেবেন।
(১৪) মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে জনসমর্থনের বিষয়ে সজাগ থাকা যুক্তিযুক্ত। অনুকূল জনমত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সহায়ক। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে জনগণের কী উপকার হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে তা সমবেত জনতাকে প্রয়োজনে ব্যাখ্যা করে বুঝানো যেতে পারে। সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, “Justice must not only be, it must be seen to be ”.
উপরোক্ত নির্দেশিকা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, এই আইনের প্রয়োগ করার সময় ভ্রাম্যমান আদালত/মোবাইল কোর্ট আইনের স্বতঃসিদ্ধ নীতিগুলোকে অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। অবশ্যই আইনটি প্রণয়নের লক্ষ্যকে অনুধাবন করতে হবে। তফসিলে সংযুক্ত বেশির ভাগ আইন ক্ষুদ্র (petty) প্রকৃতির। ক্ষুদ্র প্রকৃতির বিষয়গুলোর মামলার কারণে যাতে আদালতগুলো অযথা ভারযুক্ত হয়ে না পড়ে এবং তফসিলোক্ত বিষয়গুলোর দ্রুত অর্থাৎ কার্যকর নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই সরকার এ আইন প্রণয়ন করেছে।
তাই এই আইনটির যথাযথ প্রয়োগে নিত্যনৈমিত্তিক জনজীবনে স্বস্তি ও আস্থার সৃষ্টি করতে পারে। অপরাধী যেমন চালক, ভেজাল বা ওজনে কম দেওয়া পণ্য বিক্রেতা, পাবলিক পরীক্ষায় নকলকারী, ভুয়া ডাক্তার, জাটকা মাছ আহরণকারী, অবৈধ ইটখোলা পরিচালনাকারী, নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত মদ, গাঁজা বহনকারী, বিক্রয়কারী বা সেবনকারী, অবৈধভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রয়ের ব্যবসায়ী, অসাধু ব্যবসায়ী, জনগণের জন্য নির্ধারিত স্থানে অবৈধ ধূমপায়ী, জুয়াড়িকে এ আইনের মাধ্যমে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব; যা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যেমন উদাহরণের সৃষ্টি করবে তেমনি সম্ভাব্য অপরাধীদের প্রতিহতও করবে।
লেখক: আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কুমিল্লা এবং হেড অব চেম্বার, ল’ ক্যাসেল- অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান এন্ড এসোসিয়েটস্।
ইমেইল- adv.shoaibr@gmail.com
Discussion about this post