সিভিল মামলা কাকে বলে? সিভিল মামলার ক্রমবিকাশ!
সিভিল মামলা বা দেওয়ানি মামলা যে কোনও ব্যক্তি বা বা সংস্থা অন্য কারোর বিরুদ্ধে আনতে পারে। যে মামলা যে আদালতে করার নিয়ম আছে, সেই আদালতের কর্মকর্তার কাছে আবেদন করে মামলাটি করা যায়। চলুন জেনে নেই সিভিল মামলা কাকে বলে ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে।
সিভিল মামলা কাকে বলে?
দেওয়ানী ( Civil) অধিক্ষেত্রসম্পন্ন আদালতে প্রয়োগযোগ্র্য সাধারণ পদ্ধতিগত আইনকে দেওয়ানী কার্যবিধি বলা হয়। এই বিধি দ্বারাই দেওয়ানী (Civil)ধরনের মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ১৯০৮ সালে দেওয়ানী কার্যবিধি ( ১৯০৮ সালের ৫ নং আইন প্রবর্তিত হয়। বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়ে আমাদের দেশে এ বিধি প্রচলিত আছে।
মানুষের সম্পত্তি , দাবি এবং অধিকার নিয়ে যুগে যুগে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, গোত্রে গোত্রে, সমাজে সমাজে বিরোধ দেখো দেয়।এই বিরোধ নিস্পত্তির জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন ধরনের বিচার প্রথা প্রচলিত ছিল। বর্তমান সামাজিক পরিবর্তন ও বিবর্তনের ফলে বিচারবাবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে।
সাধারণত মানুষের অধিকার এবং কর্তব্যবিষয়ক নীতিসমূহ দেওয়ানী কার্যবিধির বিধানসমূহ দ্বারা বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে ।

সিভিল মামলা এর ক্রমবিকাশ!
১৮৫৯ সালের ৮ নং আইনই হচ্ছে দেশের প্রথম দেওয়ানী কার্যবিধির আইন। এর আগে বিশেষ আইন ও বিধি দ্বারাই আদালত সমূহের কার্যপরিচালনা পরিচালিত হতো। এই আইন ও বিধি গুলো ১৮৬১ সালের ১০ নং আইন দ্বারা বাতিল করা হয়। ১৮৬২ সালে হাইকোর্ট আইন দ্বারা সুপ্রীম কোর্ট এবং প্রেসিডেন্সী শহরসমূহ থেকে সদর দেওয়ানী আদালত সমূহ বিলুপ্ত করা হয় এবং এই সকল ক্ষমতা হাইকোর্টেসমূহের উপর অর্পণ করা হয়।
১৮৬২ সালে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করে প্রদত্ত ক্ষমতা সরকারের ক্ষমতা -পত্র অনুযায়ী ১৮৫৯ সালের কার্যবিধির পরিচালনা বিধি এদের উপর প্রযোজ্য করা হয়।১৮৬০,১৮৮৭,১৮৭১,১৮৭২ সালে পরবর্তী সংশোধনী আইনসমূহ পাস করা হয়।
পরবর্তী বিধি হচ্ছে ১৮৭৭ সালের ১৯ নং আইন যার দ্বারা ১৮৫৯ সালের বিধি বাতিল করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন সংসোধনীর পর ১৯০৮ সালের ৫ নং আইন দ্বারা পরিপূর্ণভাবে বর্তমান দেওয়ানী কার্যবিধির উদ্ভব হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পরে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই বিধিটিকে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে পরিচালনার জন্য বিবিন্ন সংশোধনী আইন পাস করা হয় । পাকিস্তান আমলেও দেওয়ানী কার্যবিধির বেশ কিছু সংস্কার আনা হয়েছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ৪৮ নং আদেশ দ্বারা (P.O.48/720) পাকিস্তান আমলের প্রচলিত আইনকে বাংলাদেশে গ্রহন করা হয় ।
দেওয়ানী কার্যবিধির বিষয় বস্তু সম্বদ্ধে বলা যায়, দেওয়ানী কার্যবিধি দুই অংশে বিভক্ত । প্রথম অংশে রয়েছে ১৫৮ টি ধারা। এটাকে বিধির দেহ বলা হয় । আর দ্বিতীয় অংশে রয়োছে আদেশ, যাকে বিধি বলা হয় । প্রথম অংশে রয়েছে স্থায়ী বিধান যা সাধারণ মুলনীতি নির্দেশ করে , অপরদিকে রয়েছে বিধি যা কার্যপরিচালনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিধির দেহ হচ্ছে মৌল বিষয় যা অধিক্ষেত্রের সৃষ্টি করে । পার্লামেন্ট ছাড়া এটা পরিবর্তন করা যায় না্। হাইকোর্ট বিভাগের বিধির অংশে সংযোজিত নিয়মের পরিবর্তন ,বাতিল বা সংযোজন করার ক্ষমতা রয়েছে ।
তবে শর্ত হচ্ছে উক্ত পরিবর্তন , বাতিল বা সংযোজন বিধির প্রথম অংশের বিধার তথা ধারার সাথে কোন অপসংযোগ হতে পারবে না। তাই বলা যায় ধারা সমূহ সাধারণ মুলনীতি নির্দেশ করে এবং অপর দিকে নিয়ম বা বিধি তা কিভাবো প্রয়েঅগ করা যেতে পাারে তার উপায়ের ব্যবস্থা করে । তবে মনে রাখতে হবে যদি নিয়ম বা বিধির সাথে ধারার সাথে কোন অসংগতিপূর্ণ হয় তবে ধারা প্রযোজ্য হবে।
বিশেষভাবে নিদিষ্ট বিষয়ে আদালত বিধির সত্যিকারের ব্যাখ্যার বাইরে যেতে পারেনা বা তার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে পারে না । যে সকল বিষয়ে ১৫১ ধারা অনুযায়ী পারিপার্শিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অথবা ঘটনার অত্যাবশ্যকীয় অবস্থার দাবি অনুযায়ী দুই পক্ষের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে আদেশ প্রদানের সহজাত ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। এই অবস্থায় দেওয়ানী কার্যবিধিকে সম্পুর্ণ বিধি বলে গণ্য করা যায় না।
এই আইন ১৯০৮ দেওয়ানী কার্যবিধি নামে পরিচিত।১৯০১ সালের ১ লা জানুয়ারী থেকে এই আইন কার্যকর করা হয় এবং বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশে এই আইন প্রচলিত রয়েছে।
১৯০৮ সালে দেশে দেওয়ানী আইন পাশ হবার পূর্বেও দেশে আইন আদালত ছিল । সুতরাং পূর্বেও দেওয়ানী কার্যবিধিও ছিল।দেওয়ান কার্যবিধি আইন পাশ হবার পূর্বে দেশে ১৮৮২ সালের দেওয়ানী কার্যবিধি প্রচলিত ছিল। ১৮৮২ সালের দেওয়ানী কার্যবিধিতে কোন আদেশ বা বিধির ( Order or Rules) উল্লেখ ছিল না। তবে ধারার সংখ্যা ছিল ৬৫৩ টি।

বলা যায় অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে পদ্ধতিগত আইনের প্রয়োগের সুবিধার ক্ষেত্রে পুরাতন আইনকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে নতুন করে সাজানো হয়েছে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যেমন সমন সম্পর্কে সাধারণ নীতিগুলি লিপিবদ্ধ আছে ২৭/২৮ ধারায় এবং সমন বিষয়ে যাবতীয় অন্যান্য নিয়মাবলী লিপিবদ্ধ আছে ৫ আদেশের ১-৩০ নং বিধিতে।
অনুরূপভাবে Interpleader suit বিষয়ক সাধারণ নীতিগুলি লিপিবদ্ধ আছে ৮৮ ধারায় এবং Interpleader suit বিষয়ে অন্যান্য নিয়মাবলী পাওয়া যাবে ৩৫ আদেশের ১-৬ বিধিতে।
১২২ ধারায় উল্লেখ আছে সুপ্রীম কোর্ট সময়ে সময়ে স্বীয় কার্য পদ্ধতি ও অধস্তন দেওয়ানী আদালত সমূহের কার্য় পদ্ধতি নিয়ন্ত্রন কল্পে বিধি প্রনয়ন ও প্রকাশ করতে পারবেন এবং উক্তরূপ প্রণীত বিধি বলে যে কোন বিধি বাতিল, সংশোধন বা সংযোজন করতে পারবেন। ১২৩ ধারা অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্ট ‘বিধি প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করে ১২২ ধারায় বর্ণিত কার্যাদি সম্পন্ন করে থাকেন । বিধি প্রণয়ন কমিটির গঠন পদ্ধতি এবং এর এখািতয়ার অত্র আইনের ১২৩-১২৮ ধারাতে বর্ণিত আছে।
Discussion about this post