ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনঃ-
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ ( ২০১৮ সনের ৪৬ নং আইন )। ডিজিটাল নিরাপত্তা আ্ইন মূলত ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ করা হয়েছে। যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে এই আইনের উৎপত্তি।ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিঃ-

ডিজিটাল নিরাপত্তা অর্থ কোনো ডিজিটাল ডিভাইস বা ডিজিটাল সিস্টেম এর নিরাপত্তা। ডিজিটাল অর্থ ডিজিট ভিত্তিক কার্য পদ্ধতি যেখানে ইলেকট্রিক্যাল, ডিজিটাল ম্যাগনেটিক, অপটিক্যাল, বায়োমেট্রিক, ইলেকট্রোকেমিক্যাল, ইলেকট্রোমেকানিক্যাল, ওয়্যারলেস বা ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক টেকনোলজি এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
ডিজিটাল ডিভাইস’ অর্থ কোনো ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল, ম্যাগনেটিক, অপটিক্যাল বা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্র বা সিস্টেম, যা ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল, ম্যাগনেটিক বা অপটিক্যাল ইমপালস ব্যবহার করিয়া যৌক্তিক, গাণিতিক এবং স্মৃতি কার্যক্রম সম্পন্ন করে, এবং কোনো ডিজিটাল বা কম্পিউটার ডিভাইস সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সহিত সংযুক্ত, এবং সকল ইনপুট, আউটপুট, প্রক্রিয়াকরণ, সঞ্চিতি, ডিজিটাল ডিভাইস সফটওয়্যার বা যোগাযোগ সুবিধাদি এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যক্তি বলতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, অংশীদারি কারবার, ফার্ম বা অন্য কোনো সংস্থা, ডিজিটাল ডিভাইস এর ক্ষেত্রে উহার নিয়ন্ত্রণকারী এবং আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট কোনো সত্তা বা কৃত্রিম আইনগত সত্তাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বা উক্তরূপ অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনক্রমে কোনো কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস বা ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ, বা উক্তরূপ প্রবেশের মাধ্যমে উক্ত তথ্য ব্যবস্থার কোনো তথ্য-উপাত্তের আদান-প্রদানে বাধা প্রদান বা উহার প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত বা ব্যাহত করা বা বন্ধ করা, বা উক্ত তথ্য-উপাত্তের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন বা সংযোজন বা বিয়োজন করা অথবা কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে কোনো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী বেআইনি প্রবেশ বলে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় অপরাধ সমূহঃ-

(১) গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বে-আইনি প্রবেশ
(২) কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেম, ইত্যাদিতে বে-আইনি প্রবেশ
(৩) কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ইত্যাদির ক্ষতিসাধন
(৪) কম্পিউটার সোর্স কোড পরিবর্তন
(৫) মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা
(৬) ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক জালিয়াতি করা
(৭) ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণা করা
(৮) পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ করা
(৯) আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ
(১০) অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার
(১১) সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটণ
(১২) ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার
(১৩) মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার
(১৪) আইনানুগ কর্তৃত্ব বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশন
(১৫) আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো
(১৬) সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গ করা
(১৭) বে-আইনিভাবে তথ্য-উপাত্ত ধারণ, স্থানান্তর
(১৮) হ্যাকিং
(১৯) অপরাধ সংঘটনে সহায়তা
(২০) কোম্পানি কর্তৃক অপরাধ সংঘটন ইত্যাদি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর আওতায় এগুলা অপরাধ।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় অপরাধের সর্বনিম্ন সাজা সমূহঃ-
মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860) এর section 499 এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা সমূহঃ-

যদি কোনো ব্যক্তি হ্যাকিং করেন, তাহলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমাঃ-

(১) ট্রাইব্যুনালের বিচারক এই আইনের অধীন কোনো মামলার অভিযোগ গঠনের তারিখ হইতে ১৮০ (একশত আশি) কার্য দিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করিবেন।(২) ট্রাইব্যুনালের বিচারক উপ-ধারা (১) এর অধীন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো মামলা নিষ্পত্তি করিতে ব্যর্থ হইলে, তিনি উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া উক্ত সময়সীমা সর্বোচ্চ ৯০ (নব্বই) কার্য দিবস বৃদ্ধি করিতে পারিবেন।(৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারক কোনো মামলা নিষ্পত্তি করিতে ব্যর্থ হইলে, তিনি উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে হাইকোর্ট বিভাগকে অবহিত করিয়া মামলার কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখিতে পারিবেন।
তদন্তকারী অফিসারের ক্ষমতাঃ-
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীন কোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্তকারী অফিসারের নিম্নবর্ণিত ক্ষমতা থাকিবে, যথা :-(ক) কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা কোনো ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা কোনো প্রোগ্রাম, তথ্য-উপাত্ত যাহা কোনো কম্পিউটার বা কম্প্যাক্ট ডিস্ক বা রিমুভেবল ড্রাইভ বা অন্য কোনো উপায়ে সংরক্ষণ করা হইয়াছে তাহা নিজের অধিকারে লওয়া;
(খ) কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার নিকট হইতে তথ্য প্রবাহের (traffic data) তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ;
(গ) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্য।
এই আইনের অধীন তদন্ত পরিচালনাকালে তদন্তকারী অফিসার কোনো অপরাধের তদন্তের স্বার্থে যে কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গ্রহণ করিতে পারিবেন।
তদন্তে সহায়তাঃ-
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীন তদন্ত পরিচালনাকালে তদন্তকারি অফিসার কোনো ব্যক্তি বা সত্তা বা সেবা প্রদানকারীকে তথ্য প্রদান বা তদন্তে সহায়তার জন্য অনুরোধ করিতে পারিবেন এবং উক্তরূপে কোনো অনুরোধ করা হইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সত্তা বা সেবা প্রদানকারী তথ্য প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করিতে বাধ্য থাকিবেন।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের গোপনীয়তাঃ-
তদন্তের স্বার্থে কোনো ব্যক্তি, সত্তা বা সেবা প্রদানকারী কোনো তথ্য প্রদান বা প্রকাশ করিলে উক্ত ব্যক্তি, সত্তা বা সেবা প্রদানকারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আইনে অভিযোগ দায়ের করা যাইবে না।
অপরাধের বিচার ও আপিলঃ-
আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধসমূহ কেবল ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচার্য হইবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতাঃ-
সাক্ষ্যগত মূল্যঃ-
Evidence Act, 1872 (Act I of 1872) বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এ আইনের অধীন প্রাপ্ত বা সংগৃহীত কোনো ফরেনসিক প্রমাণ বিচার কার্যক্রমে সাক্ষ্য হিসাবে গণ্য হইবে।
মামলা করার নিয়মঃ-
১। আবেদনকারী এবং প্রতিবাদীর নাম,ঠিকানা ও পরিচয় থাকতে হবে।
২। সাক্ষী থাকলে সাক্ষীর নাম,ঠিকানা ও পরিচয় থাকতে হবে।
৩।ঘটনা উদ্ভবের কারণ,ঘটনার স্থান ও ইউনিয়ননের নাম,সময়,তারিখ থাকতে হবে।
৪। নালিশ বা দাবির ধরন,মূল্যমান থাকতে হবে।
৫। ক্ষতির পরিমাণ প্রার্থিত প্রতিকার থাকতে হবে।
৬। পক্ষদ্বয়ের সম্পর্ক উল্লেখ থাকতে হবে।
৭। সাক্ষীদের ভূমিকা থাকতে হবে।
৮। মামলা বিলম্বে দায়ের করা হলে তার কারণ উল্লেখ থাকতে হবে।
৯। আবেদনকারীর স্বাক্ষর থাকতে হবে।
১০। মামলা দায়েরের তারিখ থাকতে হবে।
১২। মামলাটি যেহেতু ডিজিটাল ডিভাইস সংক্রান্ত সেহেতু ঘটনটার প্রমান পত্র স্বরুপ url link অবশ্যই সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করা যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে বর্তমানে আমরা এখনও সোস্যাল মিডিয়ায় না জেনে / নিজের অজান্তে অনেক ধরণের অপরাধ করে ফেলি । আমরা অনেকে জানিনা যে সেগুলো অপরাধ । তাই দেশের সকল জনসাধারণের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন,২০১৮ সম্পর্কে জানা অতি জরুরি । ধন্যবাদ
লেখকঃ ল ফর ন্যাশনস, ইমেইলঃ lawfornations.abm@gmail.com, মোবাইল: 01842459590.
Discussion about this post